The Business Standard বাংলা
তিন পুরুষের প্রতিষ্ঠান, ডিউক অভ এডিনবরার ক্যামেরাও সারানো হয়েছিল এখানে

তিন পুরুষের প্রতিষ্ঠান, ডিউক অভ এডিনবরার ক্যামেরাও সারানো হয়েছিল এখানে

সময়টা ১৯৬৭ সাল। সারাদিন ক্যামেরায় বুঁদ হয়ে থাকা এস এম সিদ্দিক নবাবপুরের রথখোলা মোড়ে চালু করেন একটি ক্যামেরা সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান। ক্যামেরার নাটবল্টু নিয়ে ঘাঁটাঘাটির নেশা অবশ্য তার আগে থেকেই ছিল। বাবা আবদুল হকের কাছ থেকে শিখেছিলেন ক্যামেরার খুঁটিনাটি। তাই নেশাকে পেশা হিসেবে নিতে খুব একটা বেগ তাকে পেতে হয়নি। বাবার কাছ থেকেই হাতেখড়ি হয়েছিল বিধায় তার পদবি অনুসারেই প্রতিষ্ঠানের নাম দেন 'হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার'। বাংলাদেশের দ্বিতীয় পুরোনো ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার হিসেবে উঠে আসে হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার-এর নাম। এর আগে অবশ্য ঢাকার আলুবাজারে 'গণি রিপেয়ারিং' নামক একটি ক্যামেরা মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। ৫৬ বছর পেরিয়ে গেছে হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার-এর। এস এম সিদ্দিকও আজ নেই। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠান এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আর এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান হর্তাকর্তা তারই পুত্র শাহেদুল হক শাহেদ। ১৯৯১ সাল থেকে বাবার ব্যবসায়ের হাল শক্ত হাতে তিনিই ধরে রেখেছেন, ব্যবসায়ের প্রসারও ঘটিয়েছেন। বাবার প্রতিষ্ঠানকে ১৯৯৬ সালে স্টেডিয়াম মার্কেটে নিয়ে আসেন তিনি। তারপর সেখান থেকে শুরু হয় নতুন পথচলা। বিভিন্ন ক্যামেরার মেলবন্ধন ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেটের তিন কিংবা চার নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করে দোতলায় উঠলেই দেখা মিলবে হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার-এর। দোতলার ১৫৮ নম্বর দোকানটিতেই পাওয়া যাবে ক্যামেরার যাবতীয় সমস্যার সমাধান। দৈর্ঘ্য-প্রস্থের বিবেচনায় দোকানের আয়তন হয়তো হবে বড়জোর কয়েক ফুট। কিন্তু এ দোকানের সামনে দাঁড়ালে ক্যামেরার সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সাক্ষাৎ হবে পঞ্চাশ–ষাট দশকের বিভিন্ন ক্যামেরার সঙ্গে — কাগজে-কলমে যেগুলোকে আমরা 'ভিন্টেজ' ক্যামেরার তালিকায় রাখি। পুরাতন এবং নতুনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায় হক অ্যান্ড সন্স-এ। ১৯৫০ সালের ক্যামেরা থেকে বর্তমান যুগের ক্যামেরা — একে ক্যামেরার ছোটখাটো মিলনমেলা বললেও ভুল হবে না। এখানকার 'ভিন্টেজ' ক্যামেরাগুলো হয়তো টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়, কিন্তু ক্যামেরাপ্রেমীরা চাইলে এক নজর দর্শনের জন্য ঢুঁ মারতেই পারেন। জার্মানির রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা থেকে শুরু করে ওয়ান টুয়েন্টি ক্যামেরা, ছোট আকৃতির ওয়ান টেন ক্যামেরা, জাপানের ইয়াসিকা ম্যাট ১২৪ জি, চীনের সিগাল ১২০ ক্যামেরা, পোলারয়েড ক্যামেরা, কোডাক ডিস্ক ৮০০০, কোকা-কোলা ক্যামেরা — সব ধরনের ক্যামেরার দর্শন এখানে পাওয়া যাবে। পোলারয়েড ক্যামেরার বৈশিষ্ট্য হলো এটি দিয়ে ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্ট হয়ে হাতে চলে আসে। আর কোকা-কোলার ক্যানের মতো দেখতে লাল রঙের কোকা-কোলা ক্যামেরারও দেখা মিলবে হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টারে। এ দোকানের অন্যতম আকর্ষণ টিকিটেস্ট ফ্ল্যাশ কোম্পানির ফ্ল্যাশ বাল্ব। প্রাচীন ক্যামেরাগুলোতে দিনের বেলায় অনায়াসে ছবি তোলা গেলেও অন্ধকারে ছবি তুলতে অনেক সমস্যা পোহাতে হতো। এরপর উদ্ভব হয় ফ্ল্যাশ বাল্বের। বর্তমান সময়ে ক্যামেরা ডিভাইসটির সঙ্গেই ফ্ল্যাশ যুক্ত থাকলেও চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশের দশকে ফ্ল্যাশ বাল্ব ক্যামেরা থেকে আলাদাভাবে যুক্ত করতে হতো। পারিবারিকভাবে ক্যামেরা প্রীতি হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার-এর সদস্যদের ক্যামেরার প্রতি ভালোবাসা বংশ পরম্পরাতেই গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠাতা এস এম সিদ্দিকের বাবা আবদুল হক ছিলেন বুয়েটের মেকানিক বিভাগের একজন দক্ষ মেকানিক। নিজের প্রচেষ্টাতেই ক্যামেরা নিয়ে কাজ করতেন তিনি। এর ছোঁয়া তিনি ছেলেদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। শাহেদুল হক বলেন, "দাদার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। এটা অনেকটাই 'গড-গিফটেড' ছিল। উনার ক্যামেরার বিষয়ে প্রতিভা ছিল। মেকানিজমের বিষয়গুলো দাদা ভালো বুঝতেন। তখন বাসায় বসেই কাজগুলো করতেন। দাদা যখন কাজ করতেন, তখন আমার বাবা পাশে বসে কাজ দেখতেন। আস্তে আস্তে বাবাও কাজ শিখে ফেলেন।" ষাটের দশকে দেশে সেভাবে ক্যামেরার যন্ত্রাংশ আমদানির ব্যবস্থা ছিল না। ক্যামেরার মেরামত কাজ শেখার জন্য তেমন কোনো টেকনিক্যাল বই কিংবা ম্যানুয়ালও পাওয়া যেত না। বাবার থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও শিক্ষাকে পুঁজি করেই প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্যোগ নেন এস এম সিদ্দিক। হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার নামে শুরু করেছিলেন, আজ পর্যন্তও সেই একই নামে রয়েছে। ছিল ক্যামেরা সংগ্রহের নেশা এস এম সিদ্দিকের ক্যামেরা মেরামতের পাশাপাশি সংগ্রহেরও নেশা ছিল। ছবি তোলার প্রতিও বেশ দুর্বলতা কাজ করত। পরবর্তীসময়ে যখন শাহেদুল হকের হাতে বাবার ক্যামেরাগুলো আসে, তিনিও চেষ্টা করেছেন বাবার স্মৃতি আগলে ক্যামেরা সংরক্ষণ করার। শাহেদুল বলেন, 'আমি যতটুকু সম্ভব সংরক্ষণের চেষ্টা করেছি। এগুলো সংগ্রহ করে রাখাও একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার।' ক্যামেরা কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে প্রশ্নের উত্তরে শাহেদুল বলেন, 'বাবা যখন কাজ করতেন, তখন জার্মানির তৈরি ওয়ান টুয়েন্টি ক্যামেরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হতো। ক্যামেরা নিয়ে বাবার বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তারাই বাবাকে ক্যামেরা এনে দিত।' যত দিন যাচ্ছে, ক্যামেরার প্রতি মানুষের আগ্রহও তত বাড়ছে। শাহেদুল জানান, অনেকেই ভিন্টেজ ক্যামেরা কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু বাবার স্মৃতি হিসেবে এগুলো তিনি কেবল প্রদর্শনের জন্যই রেখেছেন। এসব ভিন্টেজ ক্যামেরার নিয়মিত পরিচর্যাও করেন শাহেদুল। ডিউক অভ এডিনবরার ক্যামেরা সারিয়েছিলেন আবদুল হক এস এম সিদ্দিকের আমলে অনেক প্রথিতযশা আলোকচিত্রীর আনাগোনা ছিল হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার-এ। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর আলোকচিত্রী থেকে শুরু করে পত্রিকার আলোকচিত্রী — সবার সঙ্গে সদ্ভাব ছিল এস এম সিদ্দিকের। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ক্যামেরায় ধারণ করা বিখ্যাত আলোকচিত্রী রশিদ তালুকদারের সঙ্গেও স্মৃতি জড়িয়ে আছে শাহেদুল হকের। বাবার হাত ধরেই রশিদ তালুকদারের সঙ্গে পরিচয় হয় শাহেদুলের। 'রশিদ চাচা আমাকে অনেক আদর করতেন। ছোটবেলায় তার বাসায় যেতাম বাবার সাথে। একবার ঈদের সময় চাচা আমাকে নিজের হাতে সেমাই খাইয়ে দিয়েছিলেন,' শাহেদুল স্মৃতিচারণ করেন। কথায় কথায় শাহেদুল তার দাদা আবদুল হকের ক্যামেরা সার্ভিসিং-এ হাতযশের কথা উল্লেখ করেন। আবদুল হক নাকি ইংল্যান্ডের ডিউক অভ এডিনবরার ক্যামেরাও সারিয়ে দিয়েছিলেন। দাদার এই গল্প বাবার মুখ থেকেই শাহেদুল জেনেছেন। শাহেদুলের ভাষ্যে, পূর্ব পাকিস্তান আমলে ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ ও তার স্বামী ডিউক অভ এডেনবরা ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন। সেই সফরে অকস্মাৎ ডিউকের ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যায়। ক্যামেরাটি সারানোর জন্য সরকারের লোকজন নানান জায়গায় ঘুরে অবশেষে উপস্থিত হন আবদুল হকের কাছে। আবদুল হক নেড়েচেড়ে দেখে কিছুক্ষণের মধ্যেই সারিয়ে দেন ডিউকের ক্যামেরা। ম্যানুয়াল কিংবা ডিজিটাল — রয়েছে সব ধরনের সার্ভিসিং অতীত এবং বর্তমান মিলিয়ে ১০০টির বেশি ক্যামেরা হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার-এর কাছে রয়েছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫টি ক্যামেরা পঞ্চাশের দশক থেকে সংগ্রহ করা শুরু হয়েছে। তরুণ প্রজন্মই এখন হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার-এর মূল ক্রেতা। যারা মূলত মডেল ফটোগ্রাফি, ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করেন তারাই এখানে বেশি আসেন। পুরোনো প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বায়তুল মোকারমের ক্যামেরার দোকানগুলোতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তারাও সমাধানের উদ্দেশ্যে এ দোকানেই আসেন। ক্যামেরার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের লেন্সও পাওয়া যায় হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টার-এ। ক্যামেরা নিয়ে এখানে এলেই তারা সমস্যা বুঝে কাজ করেন। সার্ভিসিং-এর খরচ শুরু হয় ৫০০ টাকা থেকে। বাড়ানো দরকার প্রশিক্ষণ প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠানটিকে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। দিন যত এগোচ্ছে, ক্যামেরার প্রসারও তত বাড়ছে। তবে যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় তাল মেলাতে গিয়ে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান শাহেদুল। তিনি বলেন, 'টেকনোলজি আগাচ্ছে কিন্তু আমরা তো সাথে সাথে প্রশিক্ষণ পাইনি। সার্ভিসিং দেওয়ার জন্য আমাদের নিজেদেরকেই নিজেদের তৈরি করতে হচ্ছে। এজন্য অনেক কষ্ট করে আমাদের আপগ্রেড করতে হয়েছে।' ১৯৯০ সালে ফটোগ্রাফির দেড়শ বছর উপলক্ষ্যে এস এম সিদ্দিক সংগৃহীত ক্যামেরা নিয়ে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ-এ একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। সেই প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মনিরুজ্জামান মিঞা, ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত, এবং ফ্রান্স কালচারাল সেন্টারের পরিচালক। ১৯৯০ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ওই প্রদর্শনীটি আয়োজিত হয়েছিল। বাবার সংগৃহীত ক্যামেরা নিয়ে পুনরায় প্রদর্শনী আয়োজনের ইচ্ছা শাহেদুল হকেরও রয়েছে। ক্যামেরার অনেক ছোটখাটো যন্ত্রাংশ এস এম সিদ্দিক নিজে বানিয়ে নিয়েছিলেন। দুই শতাধিক এনলার্জার মেশিনও তিনি তৈরি করেছিলেন। স্বপ্ন ছিল পরিপূর্ণ রিপেয়ারিং শপ হিসেবে হক অ্যান্ড সন্স ক্যামেরা সার্ভিসিং সেন্টারকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। বাবার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমানে শাহেদুল হক কাজ করে যাচ্ছেন।
Published on: 2023-08-03 14:14:09.984767 +0200 CEST