The Business Standard বাংলা
প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির পরিণাম: আমদানির ভর্তুকি দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ

প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির পরিণাম: আমদানির ভর্তুকি দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ

ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি– সার আমদানির অর্থ দিয়ে ঋণের একটি কিস্তি পরিশোধ করেছে। শুধুমাত্র প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির কারণে– দেশের সর্ববৃহৎ ইউরিয়া উৎপাদকটি এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছে। আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরমধ্যেই প্রকল্পের জন্য জাপান থেকে নেওয়া একটি ঋণের প্রথম কিস্তির ৫২১.৩৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। সার কারখানা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জাপানি ঋণের প্রথম কিস্তি দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। এই কিস্তি দেওয়ার কথা ছিল, কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে। কিন্তু, প্রকল্প বাস্তবায়ন ৬ মাস পিছিয়ে দেওয়ায় এমন পরিস্থিতি দেখা দেয়। এই টাকা ঘোড়াশাল পেয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-র থেকে। সরকার বিসিআইসির মাধ্যমে ইউরিয়া সার আমদানি করে। ঘোড়াশাল প্রকল্পের দায়িত্বেও রয়েছে সংস্থাটি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শেই বিসিআইসি এ টাকা দেয় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। জানা যায়, কিস্তি পরিশোধের টাকা চেয়ে বেশ কয়েকবার অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বিসিআইসি। কিন্তু, মন্ত্রণালয় তা দিতে পারেনি। প্রকল্প পরিচালক রাজিউর রহমান মল্লিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'টাকার ব্যবস্থা নিয়ে একটু জটিলতা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীতে আমরা নির্ধারিত সময়েই সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পেরেছি। সারে ভর্তুকির টাকা থেকে এই কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে।' সুদ-মুক্ত এই ঋণ আপাতত বিসিআইসির ঘোড়াশাল প্রকল্পের দেনার সমস্যার সমাধান করলেও – এতে সার আমদানির টাকা পরিশোধে নতুন চাপের মধ্যে পড়লো সংস্থাটি। ইউরিয়া সার আমদানিতে বিসিআইসির ইতোমধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। নব-নির্মিতব্য কারখানাটির (ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার পিএলসি) বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯.২৪ লাখ টন। নতুন এ কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পুরোনো দুটি সার কারখানা বন্ধ করতে হয়েছে সরকারকে। বিসিআইসির সূত্রমতে,  সর্বশেষ প্রতি কেজি ইউরিয়া আমদানিতে সরকারের খরচ হয়েছে ৭০ টাকা। তবে আমদানিকৃত এই সার কৃষক পর্যায়ে ২৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। এ হিসাবে, প্রতি কেজি ইউরিয়াতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ৪৩ টাকা। *চীন ও জাপানের ঋণে কারখানা নির্মাণ* নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সার কারখানাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৯২০ টাকা ঋণ দিচ্ছে চীন ও জাপানের ঋণদাতারা। কারখানাটির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ইউরিয়ার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা ও খরচ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে, তুলনামূলক কঠিন শর্তে – জাপানি ও চীনা ঋণদাতাদের একটি কনসোর্টিয়াম – ব্যাংক অব টোকিও-মিতসুবিশি ইউএফজে লিমিটেড এবং হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি)-র থেকে ঋণ নেওয়া হয়। সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের তারিখ ছয় মাস পিছিয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলেও, ঋণ পরিশোধের সময় পেছাতে রাজি হয়নি জাপানের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। ঋণ চুক্তি অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মধ্যে জাপানি ঋণদাতাটিকে মোট তিনটি কিস্তিতে এক হাজার ২৯০ কোটি টাকা দিতে হবে। ৫১৭.৫৭ কোটি টাকার দ্বিতীয় কিস্তিটি আগামী অর্থবছরের মার্চে এবং ২৫৫ কোটি টাকার তৃতীয় কিস্তি মে মাসে দিতে হবে বলে জানান প্রকল্প কর্মকর্তারা। *ইউরিয়া আমদানিতে প্রভাব পড়বে?* জানা যায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর বিসিআইসির বোর্ড সভায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সভার বিষয়ে অবহিত কর্মকর্তারা টিবিএসকে জানান যে, আলোচনায় বিসিআইসির পরিচালকরা বলেন, নির্ধারিত তারিখের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে- তা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করবে। একারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে তারা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সারের ভর্তুকি বরাদ্দ থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিআইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, 'কিস্তি দেওয়ার ফলে সার আমদানির ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে বিসিআইসি-র ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হলো। কারণ এই টাকা দেওয়া হয়েছে সারের ভর্তুকির বরাদ্দ থেকে, যা আসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে।' তিনি আরো জানান যে, আপাতত আমদানি কমিয়ে আনারও সুযোগ নেই বিসিআইসির হাতে। কারণ, গ্যাস সংকট ও ঘোড়াশাল কারখানায় পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে– তাদের আওতাধীন তিনটি সার কারখানা বন্ধ করে রাখতে হয়েছে। বিসিআইসির সূত্রমতে, সারের আমদানির অর্থ পরিশোধে সংস্থাটি এমনিতেই চাপে রয়েছে। কারণ ইতোমধ্যেই ইউরিয়া আমদানি বাবদ প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বকেয়া আছে। কৃষি ভর্তুকির তহবিল অযৌক্তিকভাবে অপসারণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। এ ধরনের বিচ্যুতি ঘটলে অবিলম্বে তা সংশোধন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। নাহলে দেশের সার আমদানিতে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। জাহাঙ্গীর আলম খান সরকারের প্রতি দুটি সুপারিশ করেন: প্রথমত, বকেয়া বিল দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দ্বিতীয়ত,উৎপাদন শুরুর সুবিধার্থে স্থানীয় সার কারখানাগুলোয় ধারাবাহিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। *ঘোড়াশাল চালু করতে পুরোনো কারখানা বন্ধ* বিসিআইসি বর্তমানে চারটি সার কারখানা পরিচালনা করছে। এগুলো হলো- শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল), যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল), চিটাগং ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) এবং আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল)। তবে ২০২২ সালের নভেম্বরে চিটাগং ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, এবছরের এপ্রিলে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড এবং ৯ সেপ্টেম্বর যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড বন্ধ করা হয়। কারণ নির্মাণাধীন ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজারে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার এসব কারখানায় গ্যাস সরবরাহ হ্রাস করে। অর্থাৎ, নতুন কারখানায় সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগে পুরাতন কারখানাগুলিকে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে সরকারের আমদানি নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ঘোড়াশাল কারখানা বর্তমানে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে থাকলেও, প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নভেম্বরের আগে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে না। অবশ্য প্রকল্প পরিচালক রাজিউর রহমান মল্লিক বলেন, 'গ্যাসের সরবরাহ ঠিক থাকলে নতুন এ কারখানাটি অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদনে আসবে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে দ্রুত স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমানো সম্ভব হয়।' *কী পরিমাণ কৃষি ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে* চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে সার ও অন্যান্য কৃষি কর্মকাণ্ডের জন্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার ১৬ হাজার কোটি টাকা কৃষি ভর্তুকি বরাদ্দ দেয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরে ২০২২ সালে বিশ্ববাজারে সব ধরনের সার মূল্যবৃদ্ধি – ভর্তুকি বরাদ্দ বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখে। ওই বছর টিএসপি, ড্যাপ, এমওপি সারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। আগের বছরের তুলনায় এগুলোর দাম যথাক্রমে বেড়েছিল ৫৭, ৪৭ ও ১৭৭ শতাংশ।
Published on: 2023-09-16 20:47:48.007692 +0200 CEST