The Business Standard বাংলা
বিজ্ঞানীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যেভাবে গবেষণায় বিপ্লব আনছে

বিজ্ঞানীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যেভাবে গবেষণায় বিপ্লব আনছে

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউব অব টেকনোলজি (এমআইটি)-র বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় ব্যতিক্রমী একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেন। ২০১৯ সালে এর মাধ্যমে তারা হ্যালিসিন নামের নতুন একটি অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন। চলতি বছরের মে মাসে একই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীদের আরেকটি দল আবাউসিন নামের অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছেন। এপর্যন্ত জ্ঞাত সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক- প্রতিরোধী ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে এ দুটি উপাদান ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু এটাই একমাত্র বিস্ময় নয় আবিষ্কার দুটির; বরং যে পদ্ধতিতে এ আবিষ্কার হয়েছে– তারই গুরুত্ব অপরিসীম। উভয় ক্ষেত্রেই  বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে লাখ লাখ উপাদানের মধ্যে থেকে সঠিক উপাদানটিকে চিহ্নিত করেছেন। নির্দিষ্ট দুই ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক- প্রতিরোধী ব্যাক্টেরিয়া বা সুপারবাগের বিরুদ্ধে কার্যকর দুটি উপাদানকে এআই মডেল তাদের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করে। বিজ্ঞানীরা এমন কয়েক হাজার অ্যান্টিবায়োটিকের রাসায়নিক গড়ন সম্পর্কে এআই প্রোগ্রামটিকে প্রশিক্ষিত করেছিলেন। পরীক্ষাগারে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো সুপারবাগের বিরুদ্ধে কতটা কাজ করেছে বা আদৌ করেছে কিনা, সেই সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয় এআইকে। প্রশিক্ষণকালে এআই মডেলটি এসব উপাদানের রাসায়নিক গড়ন এবং সে অনুযায়ী ব্যাক্টেরিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সামর্থ্যের মধ্যে সংযোগ বোঝার চেষ্টা করে। এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয় এআই। পরে বিজ্ঞানীরা সেই তালিকার উপাদানগুলো ল্যাবে পরীক্ষা করেন, এবং এভাবেই কাঙ্ক্ষিত অ্যান্টিবায়োটিকের সন্ধান পান তারা। এমআইটির একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী রেজিনা বার্জিলে জানান, অজস্র উপাদানের মধ্যে থেকে সঠিক ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টা যদি খড়ের গাদায় সূঁচ খোজার মতোন জটিল হয়, সেক্ষেত্রে এআই কাজ করে মেটাল ডিটেক্টরের মতো। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, হাজার হাজার উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর– ল্যাব থেকে ক্যান্ডিডেট ওষুধকে ক্লিনিক পর্যন্ত নিতে অনেক বছর ধরে মেডিকেল ট্রায়াল চালাতে হয়। কিন্তু, এর প্রক্রিয়ায় "ট্রায়াল অ্যান্ড ইরর' অংশটিকে দ্রুততর করেছে এআই। ড. ব্রেজলির মতে, গবেষণা কাজে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে এআই। 'এর সাহায্যে আজ বিজ্ঞানীরা যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, আগামীতে তার চেয়েও ভিন্নতর (অগ্রসর) প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন।' শুধুমাত্র ওষুধ আবিস্কারের ক্ষেত্রেই বিপ্লব আনছে না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এরমধ্যেই বিজ্ঞানীরা এআই এর সাহায্যে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যা – আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান থেকে শুরু করে ব্যাটারি ও সৌরকোষ তৈরির নতুন উপাদান তৈরি, এমনকি পারমাণবিক ফিউশন প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ – এর সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন। আগামীর পৃথিবীর জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ এসব গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যুক্ত করে গবেষণায় নবগতি আনা গেছে। লন্ডন-ভিত্তিক এআই ল্যাব গুগল ডিপমাইন্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসসাবিস মনে করেন, 'আবিষ্কারে নতুন রেনেসাঁর যুগ আনবে এআই। মানুষের সৃজনশীলতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলার বাহনের কাজ করবে।' এআই'কে তিনি টেলিস্কোপের সাথে তুলনা করেন। কারণ টেলিস্কোপ যেমন বিজ্ঞানীদের দূর মহাকাশের অজানাকে জানার সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনিভাবে এআই-ও আরো দূরদর্শী গবেষণায় সাহায্য করবে। *গবেষণার জন্য সহজতর হয়েছে এআই ব্যবহার* ১৯৬০ এর দশক থেকেই গবেষণায় খাতে এআই ব্যবহার হয়েছে। তবে এর বেশিরভাগ সময়েই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সীমিত ছিল – কম্পিউটার কোডিং এ দক্ষতা থাকা বিজ্ঞানীদের মধ্যে। যেমন গণিত বা কণা পদার্থবিদ্যার- মতো খাতেই তা ছিল সীমাবদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডিপ মেশিন লার্নিয়ের বিকাশ ঘটেছে অপকল্পনীয় গতিতে। চলতি ২০২৩ সাল নাগাদ গবেষণার প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই এআই এর মাধ্যমে ফলাফল অর্জন করা হচ্ছে। এ তথ্য জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থা- সিএসআইআরও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বহুল প্রচলনকে প্রযুক্তিটির 'গণতান্ত্রিকায়ন' বলে অবিহিত করেন লন্ডনের অ্যালান টুরিং ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক মার্ক জিরোলামি। তার মতে, আগে এআই টুলস ব্যবহার করতে কম্পিউটার-বিজ্ঞানের ডিগ্রীধারী হতে হতো গবেষককে। জটিল প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ লিখতে- এর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, সহজে ব্যবহারযোগ্য (ইউজার ফ্রেন্ডলি) এআই টুলস দিয়েই এখন প্রোগ্রামিং ভাষা লেখা যাচ্ছে। ওপেনএআই এর তৈরি চ্যাটবট– চ্যাটজিপিটি যার অন্যতম উদাহরণ। ফলে বিজ্ঞানীরা নিরলস ও একনিষ্ঠ এক গবেষণা-সহকারী হিসেবে পাচ্ছেন এআইকে, বিপুল পরিমাণ তথ্য চোখের নিমিষে বিশ্লেষণ করে দিচ্ছে এসব প্রোগ্রাম। তথ্যগুলোর মধ্যেকার পারস্পরিক যোগসূত্রও খুঁজে দিচ্ছে। ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স (উপাদান বিজ্ঞান)- এর কথাই ধরুন, ওষুধ আবিষ্কারের মতোন এখাতেও অগণিত ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক গঠনের উপাদান নিয়ে কাজ করতে হয় বিজ্ঞানীদের। তাই উন্নত ব্যাটারি তৈরির জন্য উপযুক্ত উপাদান খুঁজে পেতে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা 'অটোএনকোডার' নামক একটি এআই মডেল ব্যবহার করেন। ইনঅর্গানিক ক্রিস্টাল স্ট্রাকচার ডেটাবেজে – দুই লাখ রকম স্থিতিশীল স্ফটিক-সদৃশ উপাদানের রাসায়নিক গঠনের তথ্য রয়েছে। অটোএনকোডার এই সমস্ত তথ্যকে বিশ্লেষণ করে সঠিক উপাদানের সন্ধান করেছে। ব্যাটারির নতুন উপাদানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কোন বস্তুগত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, এর আগে এআই'টিকে সেবিষয়ে প্রশিক্ষিত করেছিলেন বিজ্ঞানীরা, অনুসন্ধানের সময় এই জ্ঞানকে কাজে লাগায় এনকোডার। এভাবে সে পাঁচটি উপাদান শনাক্ত করে যে ফলাফল দেয়– তাতে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা ও শ্রম বেঁচে গেছে বিজ্ঞানীদের। এগিয়েছে গবেষণার মেয়াদ। নাহলে গবেষণাগারে লাখো ধরনের উপাদান তাদের একে একে বিশ্লেষণ করতে হতো। কিন্তু, এআই এর শনাক্ত করা মাত্র পাঁচটি উপাদান থেকে চূড়ান্ত একটি যৌগ উপাদান আবিস্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। বাণিজ্যিকভাবে এটি উৎপাদন ও ব্যবহার উপযোগী কিনা– তাও এখন খুব শিগগিরই জানা যাবে। আরো বিভিন্ন নতুন ধরনের উপাদান খুঁজতে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এআই ব্যবহার করছেন। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, মহাকাশ বিজ্ঞান, চিকিৎসা-সহ গবেষণার প্রায় সব খাতে নতুন যুগ আনছে এআই। বিদ্যমান গবেষণার সাথে কম্পিউটারের তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতার যোগসূত্র স্থাপন করেছে এআই, এভাবে নতুন আবিষ্কারকে সে পথ দেখাচ্ছে। অ্যালান টুরিং ইনস্টিটিউটের ড. মার্ক জিরোলামি একথাই স্মরণ করিয়ে দেন যে, মানুষের মৌলিক গবেষণার বিকল্প নয় এআই। বরং বিদ্যমান তথ্যের মধ্যে থাকা শূন্যস্থানগুলোকে পূরণ করতে পারে। এ হিসেবে এআই বর্তমানে সংযোগ স্থাপনের ভালো মাধ্যম। কিন্তু, আগামীতে হয়তো এর চেয়েও বেশি উন্নত হবে।
Published on: 2023-09-17 15:04:18.055817 +0200 CEST