The Business Standard বাংলা
পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার কী হলো?

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার কী হলো?

বছর তিনেক আগে, ২০২০ সালের ২০ আগস্ট প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. আমির হোসেন চৌধুরী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বেঙ্গল টাইগার ফিরিয়ে আনার কথা ভাবছে। এ অঞ্চলে কয়েক দশক আগেও বাঘের বসবাস ছিল। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অভ নেচার-এর (আইইউসিএন) বাংলাদেশ জাতীয় কমিটি ও একই সংস্থার এশিয়া আঞ্চলিক কমিটির যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত 'টাইগার কনজারভেশন অ্যান্ড কমিউনিটি পার্টিসিপেশন: ট্রান্সবাউন্ডারি এক্সপেরিয়েন্স শেয়ারিং' শীর্ষক বাঘ সংরক্ষণ বিষয়ক এক ই-কনফারেন্সে তিনি এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমির বলেছিলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে—পরের বছর এটি সম্পন্ন হলে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘ ফিরিয়ে আনবে কি না। চারটি টাইগার রেঞ্জ দেশের বিশেষজ্ঞরা কনফারেন্সে বাঘ সংরক্ষণে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন। ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় 'ফিজিবিলিটি স্টাডি অভ ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াইল্ডলাইফ করিডর ইন চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস অ্যান্ড কক্সেস বাজার উইথ মিয়ানমার অ্যান্ড ইন্ডিয়া' শীর্ষক ওই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে সমীক্ষাটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে এর মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্প এলাকায় করিডর তৈরির জন্য সম্ভাব্য স্থানগুলো চিহ্নিত করার কথা ছিল। এটি বন্যপ্রাণী কানেক্টিভিটির অবস্থা মূল্যায়ন ও বন্যপ্রাণীর সম্ভাব্য আবাসস্থল চিহ্নিত করবে। বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পটির জন্য ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার বেশি অর্থ দিয়েছে। এরপর ওই পরিকল্পনার কী হলো? ওই সমীক্ষায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি বাঘ ফিরিয়ে আনার উপযুক্ত নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, 'এলাকা অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের বনগুলো ঠিক আছে—কিন্তু সেখানে বাঘের জন্য পর্যাপ্ত শিকার আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।' 'কোটি কোটি টাকা খরচ করে ওই এলাকায় বাঘ ছাড়ার পর যদি দেখা যায় সেখানে বাঘের জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত শিকার নেই, তাহলে তারা মানুষের আবাসস্থলের কাছাকাছি চলে আসবে, এবং মানুষের হাতে মারা পড়বে,' বলেন তিনি। অধ্যাপক আজিজ বলেন, তারা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালিয়েছিলেন বর্ষাকালে। তাই দুর্গম বনে কাজ করা কঠিন ছিল। তিনি বলেন, ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের জন্য উপযুক্ত সময় হলো শীতকাল, কিন্তু প্রকল্পের সময়ের সেটি সম্ভব হয়নি। মাঠ পর্যায়ের কাজের জন্য মাত্র দুই মাস সময় পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। অধ্যাপক আজিজ বলেন, বাঘ ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিকার কেমন পাওয়া যাবে, তা মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থা গড়ে তোলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু বন্যপ্রাণী করিডর সমীক্ষায় এসব বিষয়কে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং বাঘ ফিরিয়ে আনা এর কেন্দ্রে ছিল না। এই বাঘ বিশেষজ্ঞ বলেন, 'তবে আমরা কিন্তু বলিনি যে এলাকাটার ওই অংশে বাঘ ছাড়া যাবে না কিংবা সেখানে কোনো বাঘ নেই। কাসালং রিজার্ভ ফরেস্টে বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত শিকার পাওয়ার ব্যাপারটি আরও খুঁটিয়ে মূল্যায়ন করার ওপর আমরা বেশি গুরুত্ব দিয়েছি—কিন্তু সেটি আমরা করতে পারিনি।' 'কোনো বনে বাঘে ফিরিয়ে আনা একটা বিশাল কাজ। আমাদেরকে বাঘের জনসংখ্যার উৎসের অবস্থান, বাঘের জিনগত অবস্থা, যেসব বাঘ স্থানান্তরিত করা হবে সেগুলোর জেনেটিক অবস্থা, যে বনে স্থানান্তরিত করা হবে সেখানে আগে থেকেই থাকা (যদি থাকে) বাঘের জেনেটিক ও স্বাস্থ্যের অবস্থা ইত্যাদি মাথায় রাখতে হবে। এরকম একটা প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে বিশাল প্রস্তুতি ও গবেষণা প্রয়োজন—এবং আমরা এর ধারেকাছেও নেই,' বলেন তিনি। ড. আজিজ আরও বলেন, বন্দিদশায় প্রজনন করা বাঘ বনে ছাড়া সম্ভব নয়। এ কারণে সুন্দরবন থেকে কয়েকটি বাঘ ধরতে হবে। সেক্ষেত্রে সুন্দরবন এলাকার বাসিন্দারা ব্যাপারটা কেমনভাবে নেবে, তা-ও মাথায় রাখতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। কম্বোডিয়ার ইস্টার্ন প্লেইনস-এর শুষ্ক বনাঞ্চলে একসময় প্রচুর বাঘ থাকত। বাঘ ও তাদের শিকার উভয়েই ব্যাপক চোরাচালানের শিকার হওয়ায় এ বনাঞ্চল শার্দূলশূন্য হয়ে পড়েছে। কম্বোডিয়ায় সর্বশেষ বাঘ দেখা গিয়েছিল ১৫ বছরেরও বেশি সময় আগে। দেশটি এই রাজসিক প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেও এখনও পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। ভারতের কিছু বাঘ কম্বোডিয়ায় স্থানান্তরিত করার বিষয়ে কম্বোডিয়া ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছে। তবে ১৫ বছর আগে রাজস্থানের সারিস্কা টাইগার রিজার্ভে স্থানান্তরকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সফলভাবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রিজার্ভগুলোতে বাঘ ফিরিয়ে এনেছে ভারত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খানও গবেষণা দলের সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, 'আমরা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বনগুলোকে সংযুক্ত করবে, এমন একটি বনভূমি করিডর তৈরির ওপর জোর দিয়েছিলাম। শিকারের সংখ্যা যাতে বাড়ে, সেজন্য আমরা আবাসস্থল পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।' মনিরুল এইচ খানও অধ্যাপক ড. আজিজের সুরেই বলেন যে একটি নতুন বনে বাঘ স্থানান্তরের পরিকল্পনা করার আগে অনেকগুলো ধাপ রয়েছে, যা হুট করেই করে ফেলা যায় না। সমীক্ষায় বিশেষজ্ঞরা এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্থানীয় জনগণকে সংবেদনশীল করাসহ অবশ্য করণীয় কাজগুলো সুপারিশ করেছেন। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে বাঘের বসবাসের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নেই। 'আদর্শ পরিবেশ থাকলে এই বনগুলোতে আগে থেকেই বাঘ থাকত, এবং প্রাণীটিকে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নই উঠত না,' বলেন তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘ আছে কি নেই, তা রহস্যে ঘেরা। জল্পনা রয়েছে, সীমান্তের এপারে কিছু বাঘ টিকে আছেই বলেই সীমান্তের ওপারেও বাঘ ঘুরে বেড়ায়। বাংলাদেশের রাঙ্গামাটির কাসালং রিজার্ভ ফরেস্টের কাছে, সীমান্তের ওপারেই ভারতের পশ্চিম মিজোরামের ডাম্পা টাইগার রিজার্ভে বাঘ রয়েছে। এছাড়াও ২০১৬ সালে ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স নামে একটি স্থানীয় সংরক্ষণবাদী গোষ্ঠী বান্দরবানের সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টে একটি বিড়ালের ১৩ সেন্টিমিটার পায়ের ছাপের ছবি তুলেছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ওই পায়ের ছাপটি বাঘের। মনিরুল এইচ খান জানান, করিডর প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি। আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং সাউথ এশিয়া সাব-রিজিয়নের প্রধান রকিবুল আমিনও বলেন যে এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বনগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করে বন্যপ্রাণী করিডোর তৈরি করা, যা হাতি ও বাঘের (যদি থাকে) চলাচলে সহায়তা করবে। রকিবুল জানান, আইইউসিএন সমীক্ষা সম্পন্ন করে বিএফডিতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, এরকম একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে বিএফডিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, ডিসি অফিস এবং সর্বোপরি স্থানীয় সম্প্রদায়সহ সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, 'আমরা দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘের আবাসস্থল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ অঞ্চলে বাঘ ফিরিয়ে আনবেন কি না, তা নিয়ে অন্য প্রশ্ন রয়েছে। আপনি কি প্রাণীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন? এ অঞ্চলে কি উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা আছে? সর্বোপরি স্থানীয় জনগণ কি এটা চায়? এ বিষয়ে আমাদের আরও পরামর্শ প্রয়োজন—এবং আমরা এটাই সুপারিশ করেছি।' প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা যায়নি। তার মোবাইল ফোন ও অফিসিয়াল নম্বরে বারবার কল করলেও রিসিভ করা হয়নি। তবে সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, বিএফডি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে এসেছে। পার্বত্য অঞ্চলে বাঘের শিকারের অভাবের পাশাপাশি মানব বসতি থাকাকে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। কিছু গবেষক অবশ্য মনে করেন, আমাদের বন্যপ্রাণী কর্মসূচি বাঘের প্রতি বেশি মাত্রায় পক্ষপাতদুষ্ট। তারা মনে করেন, আমাদের দেশে এখনও টিকে থাকা অন্যান্য প্রজাতির বন্যপ্রাণীর দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনতাসির আকাশ বলেন, 'পার্বত্য চট্টগ্রামের বনগুলো বৈশ্বিকভাবে হুমকির মুখে থাকা মাংসাশী প্রাণী, যেমন সূর্য ভাল্লুক, কালো ভাল্লুক, চিতাবাঘ, মেঘলা চিতা ও বন্য কুকুরের আবাসস্থল। এসব বনে সাম্বার, সেরো, মান্টজ্যাক এবং শুকর আছে—ট্রফি ও ক্যামেরা-ট্র্যাপের ফুটেজের মাধ্যমে এদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাঘ-কেন্দ্রিক কৌশল থেকে বেরিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার এখনই সময়।' পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমির সংরক্ষণ দেশের অন্যান্য বনের তুলনায় অনেক জটিল। এ বনাঞ্চলের বেশিরভাগই আনক্লাসড স্টেট ফরেস্ট (ইউএসএফ) হিসেবে শ্রেণিভুক্ত। বাংলাদেশের মোট বনভূমির প্রায় ২৯ শতাংশই পার্বত্য চট্টগ্রামের বন। আর এ বনাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের হাতে নয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের হাতে। এছাড়া কয়েক দশকের সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে এই বনের অনেক অংশে বেসামরিক প্রশাসন ও পর্যটকরা প্রবেশ করতে পারে না। একই কারণে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির অনেক অংশে (কাসালং রিজার্ভ ফরেস্টসহ) বেসামরিক নাগরিরা যেতে পারে না।
Published on: 2023-09-02 17:57:56.616438 +0200 CEST