The Business Standard বাংলা
ইন্টারনেট জঙ্গলে যে কেউ শিকার! ডিপফেক ‘প্রেডাটর’ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়

ইন্টারনেট জঙ্গলে যে কেউ শিকার! ডিপফেক ‘প্রেডাটর’ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে মানুষের হাইপার-রিয়ালিস্টিক প্রতিরূপ তৈরির প্রযুক্তি ডিপফেক ক্রমশ সারাবিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এ সপ্তাহে স্পেনের বাদাহো প্রদেশে এআই দিয়ে তৈরি অপ্রাপ্তবয়স্কদের নগ্ন ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর ডিপফেকের ভয়াবহ প্রভাব আবারও সামনে এসেছে। ২০১৯ সালে ডিপট্রেস নামক একটি প্রতিষ্ঠান ডিপফেক নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা ইন্টারনেটে প্রায় পাঁচ লাখ ভুয়া ফাইল খুঁজে পায়। কোম্পানিটির আগের প্রতিবেদনের তুলনায় ওই বছরের প্রতিবেদনে অনলাইনে ডিপফেক ছড়িয়ে পড়ার হার প্রায় শতগুণ বৃদ্ধি বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের তথ্য। ডিপফেক কনটেন্টের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে সম্যক ধারণা নেই। তবে এটা জানা গেছে যে, ডিপফেক ভিডিওর ৯৬ শতাংশ পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত। আর বর্তমানে ছবি, কণ্ঠস্বর, লেখা, নথিপত্র, ফেসিয়াল রেকগনিশন এবং এগুলো সবের সমন্বয় এআই দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। ইউরোপিয়ান টেলিকমিউনিকেশনস স্ট্যান্ডার্ডস ইনস্টিটিউট (ইটিএসআই) ভুয়া কনটেন্ট তৈরিতে এআই 'ব্যবহারের ক্রমশ সহজলভ্যতা'র বিষয়ে সতর্ক করেছে। এক প্রতিবেদনে এটি জানিয়েছে, এআই ব্যবহার করে ব্যক্তির সম্মানহানি থেকে শুরু করে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা জনমত পরিবর্তনে প্রচারণা চালানো সবই করা সম্ভব। বর্তমানে পর্নোগ্রাফি, জনমত বদলাতে ভুল তথ্য ছড়ানো, প্রকৃত কোনোকিছুকে ভুল প্রমাণ, ইন্টারনেট নিরাপত্তা আঘাত, নকল লেখক-অভিনেতা দিয়ে সিনেমা তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ডিপফেকের বেশি ব্যবহার হচ্ছে। পর্নোগ্রাফি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক ড্যানিয়েল ক্লিট্রন বলেন, 'পর্নোগ্রাফিতে নারীদের মুখ বসিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে ডিপফেক প্রযুক্তি। 'ডিপফেক পর্নোগ্রাফির কারণে মানুষের জন্য অনলাইনে সম্পর্ক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, চাকরি পেতে কষ্ট হয়, চাকরি চলে যায়। ব্যক্তি অনিরাপদবোধ করেন।' কারও ভুয়া পর্নোগ্রাফিক ডিপফেকের ফলে অপূরণীয় সামাজিক মর্যাদাহানি হতে পারে। এগুলো কোনো মেয়ের জীবনও নষ্ট করে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন স্পেনের এক্সট্রেমাদুরা শহরের শিক্ষার্থীদের অভিভাকদের একটি সংগঠনের সভাপতি ম্যারিবেল রেঙ্গেল। ডিপফেক আক্রমণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে অপমান করা বা ব্যক্তির সম্মানহানির উদ্দেশ্যে ওই ব্যক্তির ভুয়া ভিডিও, ছবি, অডিও বা লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। প্রায়ই ডিপফেক কনটেন্টের শিকার হন সেলিব্রেটিরা। অতীতে এমা ওয়াটসন বা নাটালি পোর্টম্যানের ডিপফেক তৈরি করেছিল দুর্বৃত্তরা। এ তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছেন স্প্যানিশ শিল্পী রোজালিয়া। তবে ডিপফেক প্রযুক্তি থেকে কেউই নিরাপদ নন। অনলাইন দুনিয়ায় এমন অনেক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম আছে যেখানে কাউকে এক সেকেন্ডে 'নগ্ন করার' বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন বা ওয়েবসাইট পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং সিস্টেমেও এ ধরনের ডিপফেক তৈরি করা যায়। এসব সাইটে আবার বেশকিছু সতর্কবাণীও লেখা থাকে। এ ধরনের সাইটে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অনুপযুক্ত কথাটি লেখা থাকে। আবার জানানো হয়, কেউ অন্য ব্যক্তির ছবি তাদের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করতে পারবে না। যদিও এখানে কে কী করছে তা দেখার কেউ নেই। পুরো ব্যাপারটিই ব্যবহারকারীর ওপর নির্ভরশীল। এসব সাইটেে দাবি, পুরো বিষয়টির উদ্দেশ্য কেবলই 'বিনোদন'। মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থা এফবিআই সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও নিয়ে ডিপফেক তৈরির হার বর্তমানে বেড়েছে। জনমতে প্রভাব ফেলতে ভুয়া তথ্য ডিপট্রেস-এর প্রতিষ্ঠাতা জিওর্জিও পাত্রিনি বলেন, 'ডিপফেক ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে শুরু করেছে। কোনো পালটা ব্যবস্থা ছাড়া বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক অখণ্ডতা হুমকির মুখে রয়েছে।' ইটিএসআই-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ ধরনের আক্রমণে সাধারণত এমন সব মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করা হয় যেগুলো দেখে মনে হতে পারে প্রভাবশালী পদে থাকা কোনো ব্যক্তি ওসব তথ্য লিখেছেন, বলেছেন বা তারা নির্দিষ্ট কোনো ধরনের কাজ করেছেন। এ ধরনের ডিপফেক কনটেন্ট কারও চরিত্রহনন, বাজারমূল্য বদল, প্রতিযোগীর ওপর আক্রমণ, নির্বাচনের সময় বা রাজনীতিতে জনমতে প্রভাবসৃষ্টি, ভুয়া তথ্যকে আরও বেশি মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে বলে জানিয়েছে ইটিএসআই। ২০২২ সালের মার্চ মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির একটি ডিপফেক ভিডিও প্রকাশ পায়। ওই ভিডিওতে তাকে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন আত্মসমর্পণ করছে বলতে শোনা যায়। মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক দলের রাজনীতিবিদ ন্যান্সি পোলেসির ডিপফেক ভিডিওতে তাকে নেশাগ্রস্ত হিসেবে দেখা যায়। একই ধাঁচের ডিপফেক ভিডিওর শিকার হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বারাক ওবামা, পোপ ফ্রান্সিস ও ইলন মাস্ক। প্রামাণিক বিষয়কে লক্ষ্য করা এ ধরনের সাইবার আক্রমণে দূর থেকে কারও বায়োমেট্রিক তথ্য বা অথেন্টিকেশন প্রক্রিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশে ব্যবহারকারীকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ ডিজিটাল সেবায় অ্যাক্সেস দিতে এ প্রক্রিয়াটিতে বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বর্তমানে। ইন্টারনেট নিরাপত্তা মানুষের ভুলের কারণে হ্যাকাররা সহজেই অন্যের নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু আজকাল নকল তথ্য এতই দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করা যাচ্ছে যে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। এ ধরনের পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে মূল ব্যবহারকারীর লেখার শৈলী, কণ্ঠস্বর, ভিডিও ইত্যাদি নকল করা। ২০২০ সালে হংকং-এর একজন ব্যাংক ম্যানেজারকে সাইবার দুর্বৃত্তরা ওই ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ একজন নির্বাহীর নকল কণ্ঠস্বর শুনিয়ে বোকা বানিয়ে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করাতে সক্ষম হয়। নকল অভিনেতা ও চিত্রনাট্যকারের সিনেমা ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিনেম্যাটিক কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব। সিনেমার অভিনয়শিল্পী ও লেখক উভয় পক্ষই এ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছেন। ডিপফেক প্রযুক্তি দিয়ে স্ক্রিপ্ট তথা চিত্রনাট্য লেখা যায়, বাস্তবের অভিনেতার চেহারা, দৈহিক গঠন ও নড়নচড়ন, কণ্ঠস্বর, কথা বলার ভঙ্গি সব নকল করা যায়। ব্রিটিশ অভিনেতা স্টিফেন ফ্রাই যুক্তরাজ্যে হ্যারি পটারের অডিওবইয়ে কণ্ঠ দেন। ইতিহাসবিষয়ক একটি ডকুমেন্টারিতে তার অনুমতি না নিয়েই ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে তার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন এ শিল্পী।
Published on: 2023-09-24 17:53:55.162211 +0200 CEST