The Business Standard বাংলা
লাঠিয়াল বাহিনীর দখলে মেঘনার চরের প্রায় ১ লাখ একর জমি

লাঠিয়াল বাহিনীর দখলে মেঘনার চরের প্রায় ১ লাখ একর জমি

গত ৩০-৪০ বছর যাবত লক্ষ্মীপুরের চারটি উপজেলার মেঘনা নদীর ২০টি চরে প্রায় ১ লাখ একর জমির অর্ধেকই ২৫-৩০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির দখলে চলে গেছে। দখল স্থায়ী করতে অনেকেই চরের জমি নিজেদের দাবি করে নিম্ন ও উচ্চ আদালতে অনেক মামলা জুড়ে দিয়েছেন। কিছু চরে রয়েছে সীমানা আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধ। চরে প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। আলতাফ মাস্টার। মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের বহু জমিতে চলে তার ইশারা। চরের মাছঘাটকে গড়েছেন বিনোদন কেন্দ্র, গড়েছেন নতুন বাজার, তৈরি করিয়েছেন রাস্তা। তার মতো এরকম ২৫-৩০ জনের হাতেই রয়েছে লক্ষীপুরের মেঘনায় নতুন চরগুলোর রাজত্ব বা কর্তৃত্ব। অথচ নদীসংক্রান্ত সিকস্তি ও পয়স্তি আইনে রয়েছে, নতুন জেগে ওঠা চরের মালিক সরকার। এসব জমি নথিভুক্ত করে বৈধ মালিক বা ভূমিহীনদের কাছে হস্তান্তরের দায়িত্ব জেলার ডিসি (কালেক্টর) এবং ভূমি কর্মকর্তাদের। তবে তিন থেকে চার দশক আগে জেগে ওঠা এসব চরের জমির এরকম প্রশাসনিক বিলিবন্টনের কোন ঘটনার কথা জানা নেই চরবাসীদের। ভূমি কর্মকর্তারা বলেছেন, জরিপ না হওয়া, আন্তঃজেলা সীমানা জটিলতা আর মামলা-মোকদ্দমার কারণে দুর্গম চরের জমি-জমা আয়ত্তে আনা যাচ্ছে না। এই ফাঁকে চলে চর দখল, পাল্টা দখল, খুনাখুনি। জোতদাররা নিজস্ব লাঠিয়াল দিয়ে এসব নিয়ন্ত্রণে রাখে। চলতি বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, লক্ষ্মীপুর সদর, কমলনগর এবং রামগতি পর্যন্ত ৭৬ কিলোমিটার এলাকায় মেঘনা নদীর ৮টি চর ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতি এবং দূর্গম চরের জমি উদ্ধারে সরকারের সহজ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ না থাকায় যুগের পর যুগ চর নিয়ন্ত্রণে রেখেছে স্থানীয় দখলদাররা। তাদের রয়েছে লাঠিয়াল বাহিনী। ভূমিহীন কিছু মানুষ দখলদারদের লাগদি (চাঁদা) দিয়ে চরের বসবাস কিংবা বর্গায় চাষাবাদ করে। রায়পুর উপজেলার নতুন কানিবগার চর ও চর কাছিয়ার বাসিন্দারা জানায়, প্রভাবশালীরা উত্তরাধিকারী (বয়া) সূত্রে এসব চরের মালিক। জমি হিসেব করে তারা বার্ষিক চাঁদাও নেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক নারী জানান, লাগদির টাকা না দিয়ে চরের এক ইঞ্চি জমি, নদী, খালের পানিও ব্যবহার করা যায় না। চর কাছিয়ায় রহমান মাঝিও (৩৫) জানান একই কথা। জসিম হাওলাদার (৩৫) নামক আরেক বাসিন্দা কানিবগার চরের পাশে চরকাছিয়ায় ছোট একটি বসতি স্থাপন করেছেন। একজনকে ১০ হাজার টাকা বার্ষিক লাগদি (চাঁদা) এবং ১৮ হাজার টাকা স্ট্যাম্প খরচ দিয়ে বসতির জন্য এককানি (১.৬ একর) জমি নিয়েছেন। জমিটি বন্দোবস্ত নেওয়ার জন্য ৩ বার নথি জমা দিয়েছেন। কিন্ত কাগজ করতে পারেননি। তার আশংকা এ জমিটি হয়তো দখলদাররা নিয়ে যাবে। কানিবগা নতুন বাজার থেকে পশ্চিম দিকে খালি মাঠের মধ্যখানে ছোট একটি ঝুপড়ি ঘরে তিন মেয়ে নিয়ে বসবাস করে মজিবুল সিকদার মাঝি দম্পতি। এ ঝুপড়িতেই ১২ বছর কেটেছে তাদের। মজিবুল সিকদার জানায়, চরে হাজার হাজার একর সরকারি জমি পড়ে আছে। কিন্ত তাদের এক টুকরো জমি নেই। ২০১৭ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর স্মল এটলাস থেকে জানা যায়, উত্তর চর বংশী ইউনিয়নের নতুন কানিবগার চর মৌজায় সরকারি হিসেবে জমি রয়েছে ৭ হাজার ৮শ ৬৭ একর। চর খাসিয়া, জালিয়ার চর, চর পাগলা মৌজাসহ ৪টি মৌজায় ১০ হাজার ৪শ ৯৭ একর। গ্রামবাসীরা জানিয়েছে ২০০১ এবং ২০০৮ সালে সামান্য কিছু জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। বাকি ৯০ ভাগই খাস। চরগুলোর বয়স আনুমানিক ৪০ বছর। সবগুলো চরে প্রায় ৩-৪ হাজার মানুষের বসতি রয়েছে। চরের বাসিন্দা ছালা উদ্দিন, রফিক এবং খালেক জানিয়েছেন, প্রায় ১২ বছর আগের পরিমাপের সাথে বর্তমানে সেখানে অন্তত আরো ২০ হাজার একর নতুন জমি যুক্ত হয়েছে। কানিবগার বাসিন্দা ছালা উদ্দিন(৫০), রফিক ব্যাপারি (৫০), খালেক হাওলাদার (৮০), শাহাজাহান সর্দ্দার (৬৫), কাজল হাওলাদার (৪০),আবদুল রশিদ ব্যাপারি(৬০) সহ অনেকেই গত ১৫-২০ বছর চর কাছিয়া ও কানিবগার চরে বাস করেন। এদের ১ জনের বন্দোবস্তের জমি রয়েছে। অন্যরা দখলদারদের লাগদি দিয়ে বসবাস করে। কয়েকজন কিছু দখলদারদের থেকে ২-৩ লাখ টাকা দিয়ে কার্ডের জমি ও খাস জমি কিনেছেন। *দখলদার কারা ?* বেশ কয়েকজন স্থানীয় জানিয়েছেন, মেঘনার সবগুলো চরের প্রভাবশালীদের মধ্যে জলদস্যু, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ইউপি সদস্য, ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান রয়েছেন। তারা আরো বলেন, অতীতে চর দখলকারীরা ছিল জলদস্যু। বর্তমানে মূল ভূখণ্ডের রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরা চরের একমাত্র দখলদার। তারা মূল ভূখণ্ডে বসে লাঠিয়াল বাহিনীর মাধ্যমে চরে বসবাস, চাষাবাদ, পশুপালন, মাছ ধরা, জমির বালু ও মাটি বিক্রিসহ সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। অনেকে আন্তঃজেলা বিরোধ সৃষ্টি করে একএকটি চরকে বানিয়েছে নিজের চিরস্থায়ী একক রাজ্য।
Published on: 2023-09-30 09:13:31.599117 +0200 CEST