The Business Standard বাংলা
মনে পড়ে রংবাজের কথা? প্রথা ভাঙা চলচ্চিত্র?

মনে পড়ে রংবাজের কথা? প্রথা ভাঙা চলচ্চিত্র?

তুমুল আলোচিত ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র রংবাজ মুক্তি পেয়েছিল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে – ১৯৭৩ সালের ১৬ জানুয়ারি। আড়াই ঘণ্টা ব্যাপ্তির সিনেমাটি পরিচালনা করেছিলেন জহিরুল হক — পরিচালক হিসেবে তার প্রথম কাজ ছিল এটি। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে শুরু হয় সিনেমাটির কাজ। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গণচিত্র-এর প্রথম এ নিবেদনে পরিবেশক ছিল রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনস তথা নায়ক রাজ্জাক নিজেই। মূলত চলচ্চিত্রটি প্রযোজনাও করেছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রের কাস্ট হিসেবে ছিলেন এক ঝাঁক তারকা ও সে সময়ের সিনেমা অঙ্গনের পরিচিত মুখেরা। রাজ্জাক, কবরী, আনোয়ার হোসেন, রোজী, আলতাফ, রাজু আহমেদ, হাসমত — এ নামগুলো তখনকার দর্শকের আগ্রহ জাগানোর জন্য যথেষ্ট। রংবাজ একদিক থেকে সিনেমা হিসেবে যেমন প্রথাগত ধারণার বাইরে, তেমনি আবার এ সিনেমা দিয়েই ঢাকাই চলচ্চিত্রে স্থান করে নিয়েছিল প্রচলিত বিভিন্ন ফর্মুলা। প্রথমে প্রথাবিরোধী দিক নিয়েই কথা বলা যাক। বাংলা চলচ্চিত্রে তখন পারিবারিক, সামাজিক চলচ্চিত্রের বাইরে ফোক ধাঁচের চলচ্চিত্রেরও প্রচলন ছিল। তবে যে জিনিসটি একেবারেই তেমন ছিল না, তা হলো অ্যাকশন। নব্বই দশকপরবর্তী সময়ের বাংলা সিনেমার দর্শক হয়তো কিছু অ্যাকশন দৃশ্য ছাড়া কোনো সিনেমার কথা কল্পনাই করতে পারবেন না। তবে ষাট দশকে চলচ্চিত্রে মারপিট থাকতেই হবে এমন ব্যাপার ছিল না, ছিল না কোনো 'অ্যাংরি ইয়াংম্যান'-এর চরিত্রও। কিন্তু সে পথ খুলে দেয় রংবাজ । সাধারণত নায়ক সব ভালোর সমাহার আর ভিলেন সকল খারাপের আধার — এমনভাবে চরিত্রগুলোকে 'ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট' রূপে তুলে ধরা হতো চলচ্চিত্রে। কিন্তু রংবাজ -এর নায়ক চরিত্র রাজা (রাজ্জাক) নিজেও বস্তিতে থাকা এক মাস্তান। কাজ বলতে পকেট মেরে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। তার সঙ্গে ক্রমশ আমরা ভাব জমে উঠতে দেখি বস্তির মেয়ে চিনি'র (কবরী)। এক্ষেত্রে রাজার চরিত্রটি নির্দ্বিধায় ভালো বলার মতো কেউ নয়। এ চরিত্রে আমরা 'গ্রে এরিয়া' পাব। যে রাজা রিকশায় উঠে সহযাত্রীর (আনোয়ার হোসেন) পকেট মারে, তাকেই আবার ঘটনাচক্রে সে ব্যক্তির বাড়িভাড়া মওকুফের জন্য এগিয়ে আসতে দেখা যায়। রাজার বন্ধু কালু (আলতাফ) মদ খেয়ে স্ত্রীকে বেদম পিটুনি দিলে তাকে শাসাতে যায় রাজা। এরকম আরও কিছুক্ষেত্রে আমরা রাজাকে দেখি মানবিক আচরণ করতে। কিন্তু বস্তিতে তার পরিচয় একজন পকেটমার ও মদ্যপ ব্যক্তি হিসেবেই। রংবাজ -এর আগে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে, এমনকি পুরো বাংলা চলচ্চিত্রেই নায়কচরিত্রে এমন ধূসরতা ছিল না। যদিও রংবাজ -এর নায়কের কার্যকলাপ খুবই স্পষ্ট, কিন্তু সে তার কাজের কারণেই বস্তির মানুষের সমীহ পায়, এর সঙ্গে গড়ে ওঠে তার অ্যাংরি ইয়াংম্যান ইমেজ। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাড বয়ও বলা যায় তাকে। এ সিনেমায় অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য আলাদাভাবে নির্দেশক রাখা হয়েছিল। এ দায়িত্ব পালন করেন পরবর্তীকালে নায়ক-খলনায়ক দুই ভূমিকাতেই তুমুল জনপ্রিয় জসিম। রংবাজ -এ নায়ক চরিত্রকে 'লার্জার দ্যান লাইফ' হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু সেটি অকল্পনীয় বা অবাস্তব মনে হয়না। রাজা বস্তিতে 'গুন্ডা' বলেই পরিচিত, অন্যদের মার দেওয়ার পাশাপাশি মদ্যপ অবস্থায় নিজেও মার খেয়ে আহত হয়। কাজেই তার চরিত্র বেশ নায়কোচিত ও বিভিন্ন সময়ে সেভিয়র বা ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও তা একদম অবাস্তব বোধ হয়না। সিনেমাটিতে কিছু অভিনব ব্যাপার ছিল যা সে সময়ে অপ্রচলিত হলেও পরবর্তীকালে ফর্মুলা ফিল্মের অংশ হয়ে ওঠে। মারদাঙ্গা দৃশ্যের পাশপাশি সিনেমার গানগুলোর চিত্রায়ণের কথাও বলা যায়। 'এই পথে পথে আমি একা চলি' গানটি রাজার চরিত্রটিকে সার্থকভাবে বর্ণনা করে। 'সে যে কেন এলো না' অপেক্ষা ও বিরহের কথা জানান দেয় সাবলীলভাবে। 'হৈ হৈ হৈ রঙ্গিলা, রঙ্গিলা রে' বৃষ্টির ভেতর রোমান্সের নতুন ধারার সূচনা করে। তবে সিনেমার 'রূপ দেখে চোখ ধাঁধে, মন ভোলে না' গানটি আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। গানটিতে মদে চুর রাজা ও কালু একজন নর্তকীর সঙ্গে নাচে অংশ নেয়। নর্তকীর পোশাক, বিশেষত উন্মুক্ত উদরাঞ্চল সে সময়ের প্রেক্ষিতে সাহসী হিসেবে অভিহিত হয়। তাছাড়া, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আইটেম গান — কিংবা তারও আগে ক্লাব সং/ক্যাবারে সং বলে যে গানগুলো প্রচলিত ছিল — রংবাজ -এর এ গানকে সেসবের পূর্বসূরি, এমনকি সূচনাকারীও বলা যায়। আরেকটি বিষয় ছবির শেষদৃশ্য। 'খবরদার, আইন নিজের হাতে নেবেন না। অস্ত্র ফেলে দিন' — সিনেমার শেষদৃশ্যে পুলিশ এসে নিজের হাতে সব হিসাব চুকিয়ে দিতে চাওয়া নায়ককে একথা বলেন। এমনটি আমরা বহু চলচ্চিত্রে দেখেছি। এর শুরুটা হয়েছিল এ সিনেমা দিয়েই। সে সময় রংবাজ চলচ্চিত্রের এ বিষয়গুলো ছিল দর্শকদের কাছে চমকপ্রদ ও অভিনব। সে হিসেবে এ চলচ্চিত্র প্রথাগত ধাঁচের বাইরে বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন বেশকিছু আঙ্গিক সংযোজন করেছিল। আবার, এ সিনেমায় প্রথম দেখানো এ ব্যাপারগুলো পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রের মূলধারায় নিয়মিত হতে থাকে। ফলে রংবাজ একদিক থেকে প্রথার বাইরে হলেও অন্যদিকে, রংবাজ -এর মাধ্যমে মূলধারার চলচ্চিত্রে নতুন কিছু ফর্মুলা বা প্রথাগত ট্রোপ স্থায়ী হয়। মযহারুল ইসলাম বাবলা ও অনুপম হায়াতের মতো চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা এদিক থেকে সমালোচনা করেছেন রংবাজ -এর। তাদের মতে, এটি ছিল সর্বনাশের ধারার সূচনা। তবে এও মনে রাখা দরকার, চলচ্চিত্রটি সে সময় সুপারহিট করে ও তুমুল ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। যেহেতু, দর্শক পছন্দ করছে, তাই রংবাজ -এ থাকা নতুন কিছু থিমকে অন্যান্য প্রযোজক ও পরিচাকেরাও তাদের চলচ্চিত্রে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ফলে সেগুলো একসময় প্রথাগত বা গৎবাঁধা বস্তুতে পরিণত হয়। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে মুক্তিপ্রাপ্ত রংবাজ মুগ্ধ করেছিল সে সময়ের দর্শককে। গোছানো চিত্রনাট্য, গতিশীল সিকুয়েন্স ও অভিনয়শিল্পীদের সাবলীল অভিনয় দর্শককে ব্যাপকভাবে প্রেক্ষাগৃহমুখী করেছিল। অর্ধশতাব্দী পরে এসেও তাই রংবাজ আলোচিত হবার দাবি রাখে।
Published on: 2023-09-07 08:07:25.36014 +0200 CEST