The Business Standard বাংলা
বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেট কেন দ্রুত উন্নত হচ্ছে না

বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেট কেন দ্রুত উন্নত হচ্ছে না

মোবাইল ইন্টারনেট স্পিড পারফরমেন্সে বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে কিছুটা অগ্রগতি হলেও ২০২৩ সালের নভেম্বরে ওকলা'র স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্সে ১৪৫টি দেশের মধ্যে ১০৫তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। অক্টোবরে ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১১তম। নভেম্বরে বাংলাদেশে ডাউনলোডের গড় গতি ছিল ২৩ এমবিপিএস, যা আগের মাসে ছিল ২০.৬৬ এমবিপিএস। সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩২৪.৯২ এমবিপিএসের মধ্যম ডাউনলোড গতি নিয়ে শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে। এমনকি, প্রতিবেশী ভারতও ৯৪.৬২ এমবিপিএসের মধ্যম ডাউনলোড গতি নিয়ে ১৮ তম স্থান দখল করেছে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ১৪ লাখ। এর মধ্যে ১১ কোটি ৮৯ লাখের বেশি (৯৫ শতাংশের বেশি) মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক এবং বাকিরা ব্রডব্যান্ড গ্রাহক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেন বলেন, 'ওকলা'র স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্সের র‌্যাংকিংয়ে একটি ইতিবাচক উঠে এসেছে। তা হলো বাংলাদেশের অবস্থান ভালো হচ্ছে, যদিও তা ধীর গতিতে। আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো গতি একবার দ্রুত হওয়ার পরে আর আগের অবস্থায় ফেরেনি। ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লে এবং টেলিকম কোম্পানিগুলো ব্যান্ডউইথ না বাড়ালে স্পিড কমে যাওয়ার কথা। তার মানে টেলিকম অপারেটররা তাদের ব্যান্ডউইথ বাড়াচ্ছে, যদিও তা শামুকের গতিতে। অধ্যাপক মইনুল বলেন, 'বাংলাদেশে ইন্টারনেটের গতি এখনও সন্তোষজনক নয়।' তিনি বলেন, 'যদি আপনারা আল্ট্রা হাই-ডেফিনিশন ভিডিও দেখতে চান তবে আপনার ২৫ এমবিপিএস গতির প্রয়োজন হবে, আমাদের এখানে তা নেই।' তিনি আরও বলেন, ''এর মানে হলো এটি সবচেয়ে ভালো মানের পরিষেবা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে চার বছর আগের তুলনায় বর্মানের অবস্থা যে ইতিবাচক তা অস্বীকার করার উপায় নেই।'' *ত্রুটিপূর্ণ নীতি দ্রুত গতির ইন্টারনেটের পথে বাধা* ইন্টারনেটের গতি একটি দেশের ডিজিটাল উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। তবে দ্রুত গতির ইন্টারনেটের জন্য আরও ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে টেলিকম কোম্পানিগুলো মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ কিনে থাকে। গতি বাড়ানোর জন্য তাদের আরও ব্যান্ডউইথ কিনতে হবে। অধ্যাপক মইনুল বলেন, ''টেলিকম কোম্পানিগুলো যদি তাদের গ্রাহকদের বেশি ব্যান্ডউইথ দেয়, তাহলে মোবাইল ইন্টারনেটের দাম বাড়বে। তাহলে সর্বস্তরের গ্রাহকদের জন্য এটি সাশ্রয়ী হবে না।'' মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়ে আনলে টেলিকম কোম্পানিগুলো মোবাইল ইন্টারনেটের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি দামও কমাতে পারে। আরেকটি দিক হলো, টেলিকম সংস্থাগুলো যদি উচ্চ গতির ডেটা পাঠাতে চায় তবে তাদের অবকাঠামোও পরিবর্তন করতে হবে। এতে টেলিকম সংস্থাগুলোর নতুন বিনিয়োগ করতে হবে। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পলিসি অ্যান্ড রেগুলেশন থিংক ট্যাংক এলআইআরএনইএশিয়ার সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাঈদ খান বলেন, উচ্চমূল্য ও নিম্নমানের ইন্টারনেটের মূলে রয়েছে ২০০৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল লং ডিসটেন্স টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিসেস (আইএলডিটিএস) নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। আবু সাঈদ খান বলেন, ''১/১১ থেকে জন্ম নেওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার মুষ্টিমেয় মানুষের উপকারের জন্য এই নীতি প্রণয়ন করে। তবে বর্তমান সরকার এখনও সেই নীতি ব্যবহার করছে এবং এমনকি কিছু লোকের সুবিধার্থে এর প্রসার করেছে।'' তিনি বলেন, এই নীতি অনেক 'মধ্যস্বত্বভোগীর' জন্ম দিয়েছে, যারা বিশ্বের অন্য সব দেশে অপ্রয়োজনীয় ও অস্তিত্বহীন। মধ্যস্থতাকারীরা হলেন: ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি), ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) ও ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়েস (আইজিডব্লিউ)। ফলে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) ও মোবাইল অপারেটররা সরাসরি আন্তর্জাতিক পাইকারি বাজার থেকে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কিনতে পারছে না। আবু সাঈদ খান বলেন, ''মোবাইল অপারেটররা আইআইজি থেকে ব্যান্ডউইথ কিনতে বাধ্য হচ্ছে শুধু এই মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য। এগুলো সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী।'' তিনি উল্লেখ করেন, আইএসপি ও মোবাইল অপারেটররা ভোক্তাদের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, "যেহেতু সংস্থা তিনটি, ব্যান্ডউইথের মান খারাপ হলে আপনি কাকে জবাবদিহি করবেন: এনটিটিএন নাকি আইআইজিকে? এই প্রক্রিয়ায় তাই কোনো জবাবদিহিতা নেই।'' নিম্নমানের ব্যান্ডউইথ বিক্রির জন্য সরকার বাজারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ''নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ব্যান্ডউইথের পাইকারিকরণের কোনো মান নির্ধারণ করেনি।'' তিনি আরও বলেন, ''খুচরা মূল্যে বিটিআরসি ব্রডব্যান্ড সার্ভিস প্রোভাইডার হওয়ার জন্য ন্যূনতম ১০ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ নির্ধারণ করেছে, যা সাংঘর্ষিক।'' *কী করণীয়?* অধ্যাপক মইনুল বলেন, ''বাংলাদেশ যদি রাতারাতি মোবাইল ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে চায়, তাহলে টেলিকম কোম্পানিগুলোকে টেলিকম কোম্পানিগুলোর অবকাঠামো সংস্কার করতে হবে।'' তিনি বলেন, ''দেশের ভিশন যদি 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে এই গতিতে কাজ হবে না।'' তিনি আরও বলেন, ''মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বিদ্যমান ইন্টারনেট স্পিড দিয়ে কাজ চালাতে পারে, কিন্তু এটি 'স্মার্ট বাংলাদেশ'-বাস্তবায়নের ভিশনের সঙ্গে মেলে না।'' ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ডিভাইসগুলো একটি ডিজিটাল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড এবং ডেটা আইওটি ডিভাইসের কাঁচামাল। বায়ুর গুণগত মান পর্যবেক্ষণে ইতোমধ্যে ঢাকা শহরে আইওটি ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পও আইওটি ডিভাইস ব্যবহার শুরু করেছে। শিল্পে ব্যবহারের জন্য বিপুল সংখ্যক আইওটি ডিভাইস দেশে আসবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে। বিদ্যমান মোবাইল ইন্টারনেট গতি আইওটি ডিভাইসের জন্য যথেষ্ট নয়। অধ্যাপক মইনুল বলেন, ''মোবাইল ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে এবং ব্যান্ডউইথের দাম কমাতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।'' আবু সাঈদ খান বলেন, ''মোবাইল ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে এবং মানসম্মত ব্যান্ডউইথ নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত মধ্যস্বত্বভোগীদের লাইসেন্স বাতিল করা।'' তিনি বলেন, ''ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল অপারেটররা যাতে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ব্যান্ডউইথ কিনতে পারে সেজন্য সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। '' তিনি আরও বলেন, ''আইএসপি ও মোবাইল অপারেটররা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ব্যান্ডউইথ কিনতে পারলে ইন্টারনেটের দাম কমবে এবং গুণগত মান অনেক ভালো হবে।''
Published on: 2024-01-10 05:07:29.559731 +0100 CET