The Business Standard বাংলা
২ প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপিতে অনিশ্চয়তার মুখে চট্টগ্রামের ৪০০ ফ্ল্যাট-দোকান ক্রেতা

২ প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপিতে অনিশ্চয়তার মুখে চট্টগ্রামের ৪০০ ফ্ল্যাট-দোকান ক্রেতা

২০১১ সালে চট্টগ্রাম নগরীর বাকালিয়া সৈয়দ শাহ রোডের পাশে 'এহসান সিটি' আবাসিক এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে একটি ফ্ল্যাট বুক করেন ফেরদৌস আরা। ২০১৫ সালে ফ্ল্যাটটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরে সপরিবারে নতুন ফ্ল্যাটে ওঠেন তিনি। পরে তিনি জানতে পারেন, ভবন নির্মাণের আগেই ঋণের জন্য প্রকল্পের মালিক এহসান গ্রুপ ন্যাশনাল ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার কাছে ভবনের জমি বন্ধক রেখেছিল। ওই ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। ফেরদৌস আরা বলেন, 'বুক করার এক দশক পরও আমি এখনও আমার ফ্ল্যাটের নিবন্ধন পাইনি।' কেবল তিনিই নন, আবাসিক এলাকাটির ৭টি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের প্রায় ১৫০টি ফ্ল্যাটের মালিক এহসান গ্রুপের জমি বন্ধক এবং ঋণখেলাপির কারণে একই সমস্যার মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে নগরীর স্টিল মিল এলাকার ইমাম গ্রুপের মালিকানাধীন আলী প্লাজা নামক একটি বাণিজ্যিক ভবনে ব্যবসা করা ২০০ জনেরও বেশি ক্রেতা এখন তাদের দোকানের মালিকানা ধরে রাখার বিষয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছেন। কারণ প্রাইম ব্যাংকের কাছে ভবনটির সম্পত্তি বন্ধক রেখেছিল খেলাপি হওয়া এ কোম্পানিটি। এহসান গ্রুপের কীর্তি ২০১৩ সালে ইস্পাত শিল্পে বিনিয়োগের কথা বলে ন্যাশনাল ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে এক হাজার ৩০০ শতক জমি বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছিল এহসান গ্রুপ। এ জমির ওপর এহসান সিটি নির্মাণ করা হয়। ন্যাশনাল ব্যাংকের নথি অনুসারে, গ্রুপটি বাড়তি জমি কেনার জন্য এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করে। কিন্তু গত এক দশকে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে এটি। ঋণ পরিশোধ না করায় এহসান গ্রুপের ৩টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে অর্থঋণ আদালতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে ব্যাংকটি। আদালতের নথি থেকে জানা যায়, এহসান গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠান — এহসান স্টিল রি-রোলিং ২৪২ কোটি টাকা, এহসান রি-রোলিং মিলস ১৪৫ কোটি টাকা, মেসার্স বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ৪৮ কোটি টাকা এবং মেসার্স আলম ৪৮ কোটি টাকা ঋণখেলাপি হওয়ায় ন্যাশনাল ব্যাংক ২০১৭ সালে একটি অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। এসব মামলাায় এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান আবু আলম, তার স্ত্রী পারভিন আক্তার, ভাই শফিউল আলম, মো. শহিদুল্লাহ ও ভগ্নিপতি আবু বকরকে বিবাদী করা হয়েছে। অর্থঋণ আদালতের রায়ের পর মামলাগুলো জারি মামলা হিসেবে চলমান রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ন্যাশনাল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার এক কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড কে বলেন, 'আদালত ঋণ পরিশোধের সময় ঠিক করে দিলেও কিস্তি অনুযায়ী গ্রুপটি টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। বর্তমানে এহসান গ্রুপের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের পাওনা দাাঁড়িয়েছে ৬২০ কোটি টাকা।' ফ্ল্যাটের ক্রেতারা জানিয়েছেন, গ্রুপটি এহসান সিটির ৭টি ভবনে শতাধিক ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে। আকার ও মানভেদে এসব ফ্ল্যাটের প্রতিটির মূল্য ছিল ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। এহসান সিটির আরেক ফ্ল্যাটের ক্রেতা মুজিবুল হক বলেন, খেলাপির দায়ে ২০১৭ সালে ভবনসহ এহসান প্রপার্টিজের বহু সম্পত্তি নিলামে তুলে পাওনাদার ব্যাংক। আইনি জটিলতার কারণে ফ্ল্যাটগুলোর উপযুক্ত ক্রেতা পায়নি ব্যাংক। 'এদিকে ব্যাংকের কাছে বন্ধক থাকায় সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধের পরও আমরা আমাদের ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রি নিতে পারছি না। অনেকে নিজের সারা জীবনের অর্জিত টাকা দিয়ে এসব ফ্ল্যাট কিনেছেন। নিলামের মাধ্যমে এসব ভবন বিক্রি হলে দেড় শতাধিক ফ্ল্যাট ক্রেতা নিঃস্ব হয়ে যাবেন,' বলেন তিনি। ন্যাশনাল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. শাহাদত হোসেন বলেন, 'ইস্পাত শিল্পের জন্য নেওয়া ঋণ সরিয়ে আবাসনে বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অনেক চেষ্টার পরও এই গ্রাহকের কাছ থেকে আমরা ঋণের টাকা আদায় করতে পারিনি।' এহসান গ্রুপের কর্ণধার আবু আলম বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আবাসন ব্যবসায় মন্দা চলছে। জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রিতে স্থবিরতার কারণে বিনিয়োগ আটকে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। '[কোম্পানির] সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা শোধের চেষ্টা চলছে,' বলেন তিনি। বিপাকে আলী প্লাজার দোকান মালিকেরা ২০১১ সালে নগরীর স্টিল মিল এলাকায় আলী প্লাজা নামক একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে তা দুই শতাধিক গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে ইমাম গ্রুপ। আকার ও অবস্থানভেদে প্রতিটি দোকান ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকায় বিক্রি করে এটি। দোকান বুঝে পাওয়ার পর ২০১৬ সাল থেকে ব্যবসা করে এলেও এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন দোকানদারেরা। কারণ ঋণখেলাপি হওয়ার পর ইমাম গ্রুপের কর্ণধার বিদেশ পালিয়ে যাওয়ায় ভবনটি নিলামে তুলেছে পাওনাদার ব্যাংক। আলী প্লাজার একটি দোকানের মালিক রিয়াদ হোসেন বলেন, 'ভবনটি ঋণের জন্য জামানত হিসেবে ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখার বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে এ সম্পর্কে জানতে পারি। গত ১৩ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশে আমাদের দোকান বন্ধ করে দিতে হয়। পরবর্তীসময়ে উচ্চ আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে ১৫ নভেম্বর থেকে আমরা ব্যবসা পরিচালনা করছি। তিনি আরও বলেন, 'এ সময়ে পণ্য নষ্ট ও অন্যান্য খরচ মিলে প্রতিটি দোকানের বিশাল অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে।' আলী প্লাজার আরেক দোকান মালিক মোহাম্মদ ওসমান বলেন, 'ভবন মালিকের খেলাপি ব্যাংক ঋণের কারণে আমাদের উচ্ছেদ করলে আমরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হব।' প্রাইম ব্যাংকের তথ্যমতে, ঋণের বিপরীতে আলী প্লাজাসহ ইমাম গ্রুপের বেশকিছু সম্পত্তি প্রাইম ব্যাংক জুবলি রোড শাখায় কোলাটারেল হিসেবে রয়েছে। ২০১২ সালে ৬২ কোটি টাকা ঋণখেলাপি হওয়ার পর দায়ের করা অর্থঋণ মামলাটি বর্তমানে জারি মামলা হিসেবে চলমান রয়েছে। অর্থঋণ আদালতের বেঞ্চ সহকারি রেজাউল করিম বলেন, ইমাম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ আলী দেশত্যাগ করায় আলী প্লাজায় রিসিভার নিয়োগ করেন অর্থঋণ আদালত। পরবর্তীকালে ব্যাংক মার্কেটটি বন্ধ রাখার জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করলে আদালত ব্যবসায়ী-দোকানদারদের ক্ষতির আশঙ্কায় দোকান খোলা রাখার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে দোকানদারদের ব্যাংকের কাছে ভাড়া পরিশোধ এবং মার্কেটের নিরাপত্তায় ব্যাংক সিকিউরিটি নিয়োগ করতে আদালত নির্দেশ দেন বলে জানান তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাইম ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, কোলাটারেল হিসেবে বন্ধক রাখার পর জমিটিতে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে ঋণগ্রহীতা। বন্ধক রাখার পর থেকে জমি এবং তৎপরবর্তী ভবন নির্মাণের পর থেকে ভবনে ব্যাংকের সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড লাগানো আছে। 'বন্ধক রাখা সম্পত্তি ব্যাংকের অগোচরে কেউ কিনলে সেই দায় তো ব্যাংকের না,' বলেন তিনি। এ বিষয়ে আলী প্লাজা দোকান মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, দোকানগুলো বিক্রি করে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা মুনাফা করেছেন ভবন মালিক। আমরা লাখ-লাখ টাকা দিয়ে দোকান কিনেছি। এখন ব্যাংক আমাদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছে। আমরা ব্যবসা পরিচালনা এবং মালিকানা ধরে রাখতে আইনিভাবে লড়ব।' মন্তব্যের জন্য দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ইমাম গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। তবে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
Published on: 2024-01-10 07:53:44.063155 +0100 CET