The Business Standard বাংলা
রাতের ঢাকায় আড্ডার অনুষঙ্গ এখন মাছের বারবিকিউ

রাতের ঢাকায় আড্ডার অনুষঙ্গ এখন মাছের বারবিকিউ

শীতের ঢাকায় সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ। অলিগলিতে জ্বলে উঠেছে কৃত্রিম আলো। পড়ন্ত বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ঘুরতে বেরিয়েছেন ঢাকা শহর। এদের দলনেতা রাফির বাড়ি ঢাকাতেই। বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেবেন কোথায়? সাতপাঁচ ভেবে তারা চলে এসেছেন পরীবাগে। এখানকার 'মুসলিম কাবাব' ঘরে একটি কোরাল মাছের বারবিকিউ অর্ডার দিয়ে তারা গোল হয়ে বসেছেন। একদিকে আগুনে ঝলসানো হচ্ছে খাবার, উড়ছে ধোঁয়া, অন্যদিকে জমে উঠেছে তাদের আড্ডা! খাবারের সাথে আড্ডা জমে ওঠা ঢাকা শহরের চিরাচরিত দৃশ্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব আড্ডার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে এক ধরনের বিশেষ খাবার, 'ফিশ বারবিকিউ'। একটা সময় ছিলো বারবিকিউ বলতে শহুরে মানুষ বুঝতো নানা রকম পোড়া মাংসের কথা। আগুনে ঝলসে মাছ খাওয়ার রীতি তখনও চালু হয়নি শহরে। কেবল সমুদ্রের পাড়েই চোখে পড়তো এসব খাবার। তবে মানুষের আগ্রহের কথা চিন্তা করে ঢাকার স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোতে যুক্ত হয়েছে মাছের কাবাব। দাম হাতের নাগালে হওয়ায় ভোজন বিলাসীদের মন জয় করেছে অল্প দিনে। আগুনে ঝলসানো মাছ এখন তাই ভোজন রসিকদের আড্ডার অপরিহার্য অংশ! *মাছের বারবিকিউ* খিলগাও তালতলা মার্কেটে বিকেল থেকে সরব হয়ে ওঠে খাবারের দোকানগুলো। সন্ধ্যার দিকে কাবাব আর বারবিকিউয়ের গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। পরিবার কিংবা বন্ধুদের সাথে নিয়ে যারা ঘুরতে আসেন, একে একে তারা ভীড় জমান দোকানগুলোতে। এদের অনেকেরই চোখ থাকে দোকানে সাজিয়ে রাখা হরেক রকম মাছের দিকে। মিঠা আর নোনা জলের সুস্বাদু মাছগুলোতে ততক্ষণে মাখানো হয়েছে প্রয়োজনীয় মশলা। দেখে জিভে জল আসবে যে কোন খাদ্য রসিকের! ক্রেতারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী মাছ বেছে দিতেই ব্যস্ততা শুরু হয় বিক্রেতাদের। তৎক্ষনাৎ মাছটিকে তুলে ঝলসানো হয় কয়লার আগুনে। খানিক পরেই লুচি কিংবা পরোটার সাথে তা পরিবেশিত  হয় ভোজন রসিকের প্লেটে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে কাবাবের দোকানগুলোতে ফিশ বারবিকিউ না পাওয়াই যেন অস্বাভাবিক ঘটনা এখন। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে বেশ কিছু দোকান মাছের বারবিকিউয়ের জন্যই অর্জন করেছে খ্যাতি। এছাড়াও রাজধানীর পরীবাগ, আগারগাঁও, খিলগাওয়ের মত জায়গাগুলোও মাছের বারবিকিউর জন্য বিশেষ নাম করেছে। একসময় সামুদ্রিক এলাকা ছাড়া মাছের বারবিকিউ তেমন দেখা যেতো না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহুরের মানুষের মাঝে বেড়েছে মাছের বারবিকিউয়ের জনপ্রিয়তা। তা কুয়াকাটা, কক্সবাজার কিংবা সেন্ট মার্টিন থেকে মাছের বারবিকিউ কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো ঢাকায়? খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের বিক্রেতা আনিসুর রহমান জানালেন কারণ। বললেন, 'সত্যি কথা হলো, মাছের বারবিকিউ মাংসের চেয়ে অনেক মজাদার হয়। এছাড়া অনেকেই বয়লার মুরগি খাইতে চায় না। অনেকে হার্টের রোগী, ডায়বেটিস এর রোগী, তারা মাংস খেতে চায় না। মাছটা স্বাদ বেশি, ক্ষতি কম।' আরেক বিক্রেতা সুমন হোসেন মাছের বারবিকিউ বিক্রি করছেন দু'বছর হলো। তার মতে, ভালো কিছু খাওয়ালে ক্রেতারা অবশ্যই কিনে খাবেন, মাছের বারবিকিউ সে কারণেই এত জনপ্রিয়। 'কোথাও না কোথাও থেকে পাবলিক খাওয়াটা শিখছে। আগে কক্সবাজার খাইতো।' এখন এদিকে আমরা করছি, এক দুই কইরা জনপ্রিয়তা বাড়ছে। কাস্টমার অনেকে ফিস বারবিকিউ খেয়ে দেখতে চায়, কেমন লাগে। চাহিদা অনেক বেশি।' *প্রধান আকর্ষণ সামুদ্রিক মাছ* ভোজন বিলাসীদের জন্য পরীবাগ এক আকর্ষণীয় জায়গা। শাহবাগ থেকে বাংলামোটর যাওয়ার পথে জননী ও গর্বিত বর্ণমালা ভাস্কর্যের পাশেই বিকেল থেকে শুরু হয়ে নানা ধরণের খাবার বিক্রি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি দোকানে বিক্রি হয় বারবিকিউ। সন্ধ্যা হলেই আলো জ্বলে ওঠে সেসব দোকানে। কাবাবের দোকান হলেও মাংসের চেয়ে মাছের বারবিকিউ এখানে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এদের মূল আকর্ষণ সমুদ্রের মাছ। শুধু পরীবাগ হয়, ঢাকার অন্যান্য স্থানের দোকানগুলোও সামুদ্রিক মাছ বিক্রি করে থাকে। ফলে কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা না গিয়েও সামুদ্রিক মাছের স্বাদ পাওয়া যায় এসব দোকানে। কোন কোন জায়গায় বিক্রি হয়ে থাকে সামুদ্রিক কাঁকড়া কিংবা অক্টোপাস। রাফি ও তার বন্ধুরা বেছে নিয়েছেন একটি মাঝারি আকারের কোরাল মাছ। যতক্ষণ সেটি তৈরি হচ্ছে, তারা মজে উঠলেন গল্প-আড্ডায়। রাফি জানালেন, ঢাকায় বাসা থাকার সুবাদে আগেও অনেক খেয়েছেন এখানে। বারবিকিউ করা মাছের স্বাদ তাকে আবার টেনে এনেছে। সাথে নিয়ে এসেছেন বন্ধুদের। বললেন, 'আমরা তো ক্যাম্পাসে মাঝেমধ্যেই বারবিকিউ করি, তবে সেটা হয় মাংসের। মাছের বারবিকিউ খেতে আমি এখানেই আসি। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ তো সবজায়গায় পাওয়া যায় না। মাছের বারবিকিউ বেশ টেস্টি হয়।' ছেলে-মেয়ের আবদারে সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ কিনতে ছুটে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা রুবেল হোসেন। সাথে পাঁচ-ছয় বছরের ছেলে। রুবেল অর্ডার দিলেন একটি তেলাপিয়া আর একটি কোরাল মাছ। পাশ থেকে ছেলে বলে উঠলো, 'আই লাভ ফিশ'! হাসলেন রুবেল হোসেন। বললেন, 'পাশেই আমার অফিস। ফেসবুকে ভিডিও দেখে ছেলে-মেয়ের আবদারে কিনতে এসেছি। তেলে ভাজা মাছের চেয়ে এটা বেশি মজার। এখানে তো তেল ব্যবহার করা হয় না।' *শীত এলে বাড়ে বেচাকেনা* শীতের সন্ধ্যে। কী করা যায়, কোথায় যাওয়া যায় ভাবতে ভাবতে ফিশ বারবিকিউ খাওয়াকে বেছে নিয়েছেন আফরিন জাহান। শীতের সন্ধ্যেতে পরিবার নিয়ে বারবিকিউ খাওয়াকে বেশ উপভোগ করলেন তিনি। বললেন, 'মানুষ তো অনেক সৌখিন হয়ে উঠেছে এখন। মাছের কাবাব আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিলো। আগে সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে যে জিনিস খেতো, এখন ঢাকাতেই খেতে পারছে। শীতের দিনে আমার তো বেশ ভালোই লাগে।' পরীবাগ মোড়ের আল মুসলিম কাবাবের ম্যানেজার বাবু জানালেন, সারাবছর সন্ধ্যা ছয়টায় শুরু করে রাত দশটা পর্যন্ত থাকেন। তবে শীতের দিনে খাবার তৈরি হয় বারোটা পর্যন্ত। 'সপ্তাহে সাত দিন খোলা থাকে। শীত কালে ১২ টা পর্যন্ত আমরা থাকি। শীতে বিক্রিটা বেশি হয় আমাদের।' ঢাকার নামি দামি রেস্টুরেন্টে ফিশ বারবিকিউ অনেক আগে থেকে পাওয়া গেলেও, স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোতে এটির সংযোজন ভোজন রসিকদের জন্য আশীর্বাদ, বলছেন ক্রেতারা। শীতের দিনে খাবারটির সবচেয়ে উপভোগ্য বলেও মত তাদের। *হাতের নাগালে দাম* স্বাদু পানির মাছ হিসেবে তেলাপিয়া মাছের বারবিকিউ সবচেয়ে জনপ্রিয়। আর সামুদ্রিক মাছের মধ্যে কোরাল, টুনা ও স্যামনের চাহিদা বেশি। এর পাশাপাশি রূপচাঁদা ও সুরমা মাছের খোঁজ করেন ক্রেতারা। মাছের দামগুলো নির্ধারিত হয়ে থাকে ধরন ও আকার ভেদে। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে কোরাল মাছের দাম সবচেয়ে বেশি। এক কেজি ওজনের কোরাল ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। টুনা মাছ কিনতে ক্রেতাদের খরচ করতে হয় ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা। তেলাপিয়া সামুদ্রিক মাছ না হলেও আকার ভেদে ৪৫০ টাকাতেও বিক্রি হয়ে থাকে। যে মাছ আকারে যত বড়, যে মাছের দামও বাড়িয়ে দেন বিক্রেতারা। তবে সমুদ্র সৈকতের তুলনায় ঢাকায় মাছের দাম বেশ কম বলেই দাবি করলেন তারা। অন্যদিকে দাম নিয়ে ক্রেতাদের পক্ষেও অভিযোগ পাওয়া গেলো না। অসুস্থ বোনের জন্য কোরাল মাছের বারবিকিউ কিনতে এসে এস এম নজরুল জানালেন, দোকানের সবচেয়ে বড় কোরালটাই তিনি অর্ডার করেছে। বললেন, 'সামুদ্রিক মাছ, দাম তাই একটু বেশি। তাছাড়া সেন্ট মার্টিনে আগে খেয়েছি, এমনই ছিলো দাম। দেখার বিষয় এ মাছটা ফ্রেশ আর স্বাদ হয় কিনা।' *দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে লাভ কমেছে বিক্রেতাদের* নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ায় অন্যান্য পেশাজীবিদের মতই বিপাকে পড়েছেন ফিশ বারবিকিউ বিক্রেতারা। খিলগাঁওয়ে 'বাচ্চু ভাই কাবাব ঘর'-এর কর্মচারী অমল চন্দ্র শিকদার জানালেন, বেচাকেনা আগের মত থাকলেও এখন তাদের লাভ হচ্ছে সীমিত। লাভ কেমন হয় জিজ্ঞেস করতে জানালেন দুঃখের কথা। 'এক কেজি কয়লার দাম ১১০ টাকা। কর্মচারীদের দৈনিক বেতন আছে। এক কেজি মরিচ ৮০০ টাকা। আগে ১০০ গ্রাম কাবাব মশলা কিনতাম ১০০ টাকা দিয়ে, এখন ৭০ গ্রাম ১০০ টাকা। মানে ৩০ গ্রাম নেই। সরিষার তেল, টমেটো সসসহ আরও বিভিন্ন ধরনের খরচ রয়েছে।' অমলের মতে, আগের তুলনায় তাদের লাভ কমে গেছে অনেক। 'মাল চলতাছে, আমাদের লাভ কইমা গেছে। এই টুনা আগে আছিলো ১২০ টাকা, এখন ২৮০ কি ৩৫০ টাকা কেজি। কীভাবে লাভ করমু? কোরালের কেজি ৬০০! আর কাস্টমার কী করে জানেন? আইসা দামাদামি করে। একটা মাছ ১৫০ টাকা কেনা পড়ছে, ২৫০ কি ৩০০ টাকা না বেচলে তো আমার পুঁজি থাকে না।' একই সুর শোনা গেলো সুমন হোসেনের কন্ঠে। বললেন, 'করোনার পর যে ব্যবসা ছিলো, তার অর্ধেকও এখন নাই। আমিই প্রথম শুরু করছিলাম মাছের বারবিকিউ। এখন অনেক দোকান হইছে। কিন্তু মালামাল কিনতেই তো সব টাকা চলে যাইতেছে।' তবে সামনে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমে তবে আবারও ভালো পরিমাণ লাভ করতে পারবেন বলে তার অভিমত।
Published on: 2024-01-12 16:41:52.027228 +0100 CET