The Business Standard বাংলা
প্রিন্ট অন ডিমান্ড: বই প্রকাশে, প্রকাশনায় হয়ে উঠতে পারে নতুনদের অবলম্বন

প্রিন্ট অন ডিমান্ড: বই প্রকাশে, প্রকাশনায় হয়ে উঠতে পারে নতুনদের অবলম্বন

দিনের আলো নিভুনিভু, সারাদিনের কর্মযজ্ঞ শেষে বাড়ি ফেরার পালা। কিন্তু ঢাকা শহরের যান্ত্রিকতা থামে না। ভিড় ঠেলে কেউ কেউ হঠাৎ থেমে যায়, যান্ত্রিকতার টানকে উপেক্ষা করে দু'দণ্ড দম নেয় সযত্নে মোড়ানো বই দেখে, বইয়ের মলাটে পরম যত্নে হাত বোলায়। হয়তো মাসের শেষের ফাঁকা পকেট আর একটু দীর্ঘশ্বাস সঙ্গী করেই প্রিয় বই সাথে নিয়ে আবার ছুটে চলে। রাজধানীর নীলক্ষেতে এমন চিত্র বেশ নিয়মিত। এখানে ফুটপাতের পাশে কোথাও আছে মুরাকামি, কোথাও কাফকার মেটামরফোসিস, কোথাও আছে শরতের শ্রীকান্ত। অ্যাকাডেমিক থেকে সাহিত্য — আপনি যে বিষয়ে যে বই-ই পড়তে চাইছেন, পৃথিবী এখন যেন 'সব পেয়েছির দেশ'। নীলক্ষেতে সকাল থেকে রাতের দীর্ঘ কর্মযজ্ঞে কাঠখোট্টা পিডিএফও পেতে পারে নতুন বইয়ের মোড়ক নামমাত্র খরচেই। আপনি নিজেই ইচ্ছেমতো বই ছাপিয়ে নিতে পারেন এখানে। বই ছাপার অক্ষরে জমিয়ে রাখে জীবন্ত অনুভূতি। বইয়ের ইতিহাস পেরিয়ে এসেছে বহু চড়াই-উৎরাই, অভিযোজিত হয়েছে নানা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সাথে। এসব পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে চাহিদা ও সক্ষমতার সমন্বয়ের মাধ্যমে। মুদ্রণ শিল্প বলতে চোখের সামনে যে চিত্র ভেসে ওঠে, সেটিও তৈরি হয়েছে নানা পরিবর্তনকে সাথে নিয়েই। বৃহৎ পরিসরে মুদ্রণ শিল্পের যে গতানুগতিক চিত্র, তাতে চাহিদা অনু্যায়ী পরিবর্তন এনে ভিন্নভাবে মুদ্রণকে নিয়ে কী ভাবা যেতে পারে? এক্ষেত্রেই প্রিন্ট অন ডিমান্ডের ধারণা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। প্রিন্ট অন ডিমান্ডের ধারণা প্রিন্ট অন ডিমান্ড হলো এক ধরনের বিজনেস মডেল যেখানে বই বা যেকোনো ধরনের পণ্যকে চাহিদার ভিত্তিতে, অর্ডার অনুযায়ী স্বল্প পরিসরে ছাপানো যায়। চিরাচরিতভাবে মুদ্রণ শিল্পের বৃহৎ পরিসরের কর্মযজ্ঞে কমপক্ষে তিনশ থেকে হাজার হাজার বই একসঙ্গে ছাপানো হয়। তারপর সেই বই গুদামে রেখে সারাবছর বিক্রি করা, বই ফুরিয়ে এলে আবার নতুন করে ছাপানো। এ ধারণার বাইরে গিয়ে প্রিন্ট অন ডিমান্ড মডেলে বইয়ের চাহিদা অনুযায়ী ৫০–১০০ কপি বা তার কমবেশি ছাপানো যায়। করোনাপরবর্তী সময়ে বই ছাপানো ও সরবরাহে ব্যাঘাত ও ই-কমার্সের ব্যাপক প্রসার প্রিন্ট অন ডিমান্ডের বিস্তার ঘটিয়েছে। প্রিসেন্ডেন্স রিসার্চের এক গবেষণা অনু্যায়ী ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী প্রিন্ট অন ডিমান্ডের মার্কেটের আকার ছিল ৬.৩৪ বিলিয়ন ডলার। ২০৩২ সালের মধ্যে এটি প্রায় ৬৭.৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রিন্ট অন ডিমান্ড বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রিন্ট অন ডিমান্ড বাংলাদেশের মুদ্রণ জগতে কতটা 'ডিমান্ড' পাচ্ছে তা জানতে চলে গিয়েছিলাম গাউসুল আজম এবং নীলক্ষেত এলাকায়। অলিগলিতে ব্যস্ততার ছাপ। কোথাও চলছে কর্পোরেট অফিসের ভিজিটিং কার্ড বানানো, আবার কোথাও ছাপার অক্ষরে অস্তিত্ব পাচ্ছে দেশি-বিদেশি নানান বই। গাউসুল আজমে বইয়ের কাজে ব্যস্ত গোলাম রব্বানী সুজন জানালেন, একসময় যেখানে বই থেকে বই করা হয়েছে, এখন সেখানে ইপাব, পিডিএফের মতো সফটকপি থেকে ফটোকপি মেশিনে বই তৈরি করা হয়। মেশিনগুলোর দাম নতুন হলে প্রায় তিন লাখ টাকা এবং রিকন্ডিশনড হলে এক থেকে দেড় লাখের ভেতরে। ১৯৯৮ সাল থেকে এ কাজ করে আসা সুজন জানান, মেধাস্বত্ব ছাড়া চিরায়ত বইগুলো, ব্যক্তিগত বই ছাপার পাশাপাশি অনেক সময় বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে স্টক শেষ হওয়া বইয়ের কপি ছাপানো হয়। নীলক্ষেত, গাউসুল আজম এলাকার বই ব্যবসার অন্যতম বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি বলেন, 'অল্পসংখ্যক বই, কাস্টমাইজড বই পিডিএফ থেকে এখানে কম খরচে ছাপা হয়। প্রেস থেকে প্রকাশনী এত অল্প কপি ছাপতে চায় না। আর ছাপলেও তার খরচ পড়ে অনেক বেশি।' প্রেসের ক্ষেত্রে অল্প কপি করতে সমস্যা তৈরি হয় খরচে। এ ব্যাপারে ফকিরাপুলের প্রিন্টিং প্রেসগুলোতে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত ছাপার কাজে কিছু খরচ থাকে যা সংখ্যা বৃদ্ধির সাপেক্ষে খুব একটা কমে না। প্লেটের খরচ তেমনই একটি খরচ। একটা ছাপার (বই, পোস্টার বা লিফলেট) আকার ও সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে প্লেটের আকার নির্ধারণ করা হয়। বিভিন্ন আকারের প্লেটভেদে এই খরচ ১০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে হয়। আকারে বড় হলে বইয়ের পরিমাণ কম হলেও প্লেটের খরচ বেশি থাকে। এ ছাড়া ছাপার রংসংখ্যা, পরিমাণভেদে খরচ ওঠানামা করে। হাজারের কম ছাপালে যে খরচ হিসেবে হাজারপ্রতি ৫০০ টাকা পড়ে, বেশি পরিমাণে ছাপালে সেটিই হাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় নেমে আসে। এ ছাড়া ছাপার উন্নতমান নিশ্চিত করতে গেলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ বৃদ্ধি পায়। ন্যূনতম ৩০০ কপির নিচে ফকিরাপুল বা  বাংলাবাজারের প্রেসগুলো বই ছাপাতে চায় না। তবে আর্ট পেপারের মতো উন্নতমানের কাগজে ছাপা হলে অল্পকিছু প্রেস ৫০–৬০ কপির অল্প পরিসরের কাজ করতে পারে। প্রকাশকদের ভাবনা প্রিন্ট অন ডিমান্ডের প্রতি অনাগ্রহ রয়েছে প্রকাশনীগুলোর তরফ থেকেও। কাটাবনে বিভিন্ন প্রকাশনীর সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তাদের অনেকেরই প্রিন্ট অন ডিমান্ড সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণার অভাব রয়েছে। নতুন এই ব্যাপারটিতে আগ্রহ থাকলেও ব্যাপারটিকে কিছুটা ঝামেলার বলে মনে করেন অনেকে। অল্প বই ছাপাতে যে সময় লাগছে, বেশি বই ছাপাতেও সেই সময়ই লাগছে; কিন্তু এদিকে খরচও কিছুটা বেশি, বেশি বইয়ে অল্প সময় পরপর প্লেটও বদলাতে হয় না। এদিকে এখনও পাঠকের এ ব্যাপারে চাহিদা কিছুটা কম হওয়ায় প্রকাশনীগুলোর গতানুগতিক ধারাটাই সহজ মনে হচ্ছে। তবে পেন্ডুলাম পাবলিশার্সের প্রকাশক রুম্মান তার্শফিক জানান, তার প্রকাশনীর অল্পকিছু বই বাদে বেশিরভাগ বই-ই করা হয় প্রিন্ট অন ডিমান্ডের মাধ্যমে। তাদের প্রিন্ট অন ডিমান্ডের জন্য রয়েছে নিজস্ব সেটআপ। করোনাপরবর্তী প্রভাবে ২০২১ সাল থেকে তিনি প্রিন্ট অন ডিমান্ডে কাজ করা শুরু করেন। 'খরচ বেশি পড়ছে এটা সত্যি, তবে অনেক ভিন্ন খাতে খরচ কমেও আসে। প্রতি বছর বই সংরক্ষণে যত টাকা গোডাউন ভাড়া দিতে হয় বা প্রেসে বিনিয়োগ করতে হয়, তার থেকে প্রিন্ট অন ডিমান্ড অনেক বেশি সুবিধার। আমাকে বড় অংকের টাকা বিনিয়োগ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না। বইয়ের দাম সামান্য বাড়ছে কিন্তু তা নাগালের বাইরে নয়,' বলেন এ প্রকাশক। প্রিন্ট অন ডিমান্ডের বই ছাপানো-পরবর্তী নানা সু্যোগ-সুবিধা নিয়েও জানালেন রুম্মান। যেহেতু অল্প বই ছাপাতে হচ্ছে, কাজেই ক্রেতার চাহিদা অনুসারে মার্কেট যাচাইয়ের সু্যোগ থাকছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে বই সম্পাদনার জগত আরও সমৃদ্ধ হওয়ার আশা নিয়ে তিনি বলেন, 'দেশে ভালো বই সম্পাদনার জগৎ তৈরি হতে পারে প্রিন্ট অন ডিমান্ডের মাধ্যমে। সযত্নে সম্পাদিত একটা বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো ভালো কিছু পাঠক আর প্রকাশকের কাছে হয় না।' লেখক ও পাঠকের ভাবনা প্রিন্ট অন ডিমান্ডে তুলনামূলক কম খরচে অল্প বই ছাপানোর সু্যোগ ব্যক্তিপর্যায়ে 'সেলফ পাবলিশিং' বাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তাধারা নিয়ে কাজ করা লিটল ম্যাগও উপকৃত হয় প্রিন্ট অন ডিমান্ডের মাধ্যমে। এ বিষয়ে 'নর্দমা' নামক লিটল ম্যাগের সম্পাদক ম্রিতোষ তত্রাচ বলেন, 'প্রিন্ট অন ডিমান্ডে কোনো প্রকাশনীর অধীনে ছাপার কাজটা করতে হয় না, তাই আমার নিজস্ব স্বাধীনতা রয়েছে যে কোন লেখাটা আমি ছাপতে চাইছি। লেখা নির্বাচন থেকে বিতরণ; সবকিছুর ওপর আমার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ থাকছে। পুরো কাজটার দায়িত্ব নিজের ওপর পড়লে প্রকাশনীর তরফ থেকে সেন্সরিং, নির্দিষ্ট পরিমাণে লেখা বিক্রি হওয়ার চাপ ইত্যাদিও থাকছে না।' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল খায়ের প্রান্ত বলেন, 'আমাদের বিভাগের বইগুলোর মূলকপি কোনো প্রকাশনীই ছাপায় না। কোনো বইয়ের যদি মূল তিনটি কপি এসে থাকে, তাহলে সেগুলো থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে, অফিসে এবং বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে। আমরা বইগুলোর সফটকপি থেকে প্রিন্ট অন ডিমান্ডের মাধ্যমে সহজেই ছাপিয়ে নিতে পারছি।' প্রিন্ট অন ডিমান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী, দক্ষ ও পেশাদার প্রকাশনা ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিকতা ও সচেতনতা।
Published on: 2024-01-13 15:25:03.345978 +0100 CET