The Business Standard বাংলা
মোর্শেদ মিশু ও তার দলের ‘ফেলনা খেলনা টেলনা দেয়াল’

মোর্শেদ মিশু ও তার দলের ‘ফেলনা খেলনা টেলনা দেয়াল’

মিরপুর-১৪ এর ইব্রাহিমপুর এলাকায় অবস্থান আদর্শ পল্লীর। কিছুদিন আগের কথা। এক দুপুরে কিছু তরুণ সেখানে হাজির হলেন। সাথে তাদের বস্তাবন্দি জিনিসপত্র। গলির একটি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা। ভাবছেন কীভাবে এটি নতুন করে সাজানো যায়। শুরু হলো রঙ দিয়ে রাঙিয়ে তোলার কাজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই জীর্ণ সে দেয়াল সেজে উঠল টকটকে লাল রঙে। সাথে এঁটে দেওয়া হলো কাঠের তৈরি একটি শেল্ফ। এর প্রতিটি তাকে সাজিয়ে রাখা হলো লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি রঙের হরেক রকম খেলনা। শুধু কি তাই? বড় বড় অক্ষরে লেখা হলো নামও। পুরনো সে দেয়ালের নতুন নাম 'ফেলনা খেলনা টেলনা দেয়াল'। এর নিচের দিকে লেখা ছোট অক্ষরে লেখা- 'প্রিয় ছোট্ট বন্ধু, আপনার পুরনো খেলনা এখানে দিয়ে যান, ছোট্ট বন্ধুর জন্য পছন্দের খেলনাটি নিয়ে যান প্লিজ।' ভিন্নধর্মী এ উদ্যোগ সাড়া ফেলে দেয় মানুষের মাঝে। এমনকি পাড়ার অলিগলির মানুষের কাছেও আকর্ষণীয় স্থান হয়ে ওঠে এটি। রাঙিয়ে তোলা এই দেয়ালের গল্প সাধারণ নয়। অন্য আট দশটি দেয়ালের মতো শুধু রঙে সজ্জিত নয় এটি। অসাধারণ এক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ। আর অনন্য এই উদ্যোগের পেছনের কারিগর এক যুবক। তার নাম মোর্শেদ মিশু৷ *পেছনের কারিগর* ৩০ বছর বয়সী মিশু পেশায় কার্টুনিস্ট। তিনি উন্মাদ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক। পাশাপাশি করেন অভিনয় ও উপস্থাপনাও। অনেক মানুষের কাছে মিশু এখন চেনা নাম। সাহসী সব কাজ করে তিনি জয় করে নিয়েছেন সাধারণ মানুষের মন। অসাধারণ সব কাজ করে যাচ্ছেন একের পর এক। তাই তো নিজের পেশাদারি পরিচয় ছাপিয়ে বর্তমানে তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন 'মিশু ভাই' নামে। পরিচ্ছন্ন দেশ গড়তে বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি করছেন মানবিক কাজও। এর আগেও তার বিভিন্ন কাজে মুগ্ধ হয়েছে মানুষ। বিভিন্ন কাজে তার পাশে থেকেছেন। কেউ কেউ তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মিশুর সামনের পরিকল্পনাও এমনই। এতেই যেন তার আনন্দ, এতেই তার সুখ। বছর দেড়েক আগের কথা। একদিন পণ করে বসলেন রাজধানী ঢাকার ২০০টি জায়গা ময়লামুক্ত করবেন তিনি। সানন্দেই এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালেই তিনটি প্রজেক্টের কাজ শেষ করেন। 'ফেলনা খেলনা টেলনা দেয়াল' সেগুলোর একটি। *'ফেলনা খেলনা টেলনা দেয়াল'* মোর্শেদ মিশু বলছিলেন, ''কাহিনির শুরু মেহেদি ভাইয়ের মাধ্যমে। দিন কয়েক আগে আমার ফোনে তার কল আসে। ফোন ধরেই ওপাশ থেকে মেহেদি ভাই বলে উঠলেন, 'মিশু, একজন চমৎকার মানুষ কিছু খেলনা পাঠিয়েছে, অমুক জায়গায় দিতে চাই, কী বলিস?'। ব্যস, আমার মাথায় ঢুকে গেল বিষয়টা। ভাবতে ভাবতে একটা আইডিয়াও এলো। ভাবলাম খেলনার একটা দেয়াল হলে কেমন হয়? যেই চিন্তা সেই কাজ। নেমে পড়লাম কাজে। সাথে বন্ধু, বড় ভাই, ছোট ভাই অনেকেই এগিয়ে আসে। শুরুটা হয় ঠিক এভাবেই।' ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৩। মিশুর ইচ্ছা হলো যেমনটা চিন্তা করে রেখেছেন সে অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করার। সিদ্ধান্ত নেন রাজধানীর মিরপুরের  ইব্রাহিমপুর আদর্শ পল্লীর একটি দেয়াল রাঙাবেন। এর আগেও করেছেন রঙ করার কাজ। তার ডাক পেয়ে সাথে সাথেই সাড়া দেন বন্ধুবান্ধবরা। ক্রিসমাসের দিনেই রাঙানো হলো দেয়াল। মিশুই যেন হয়ে গেলেন সান্তা ক্লজ। রঙ করিয়ে খেলনা সাজিয়ে রাখার আধাঘণ্টার মধ্যেই জড়ো হয়ে গেল মানুষ। শিশুরা বেছে নেওয়া শুরু করল তাদের পছন্দের খেলনা। শর্ত একটাই,  একজন কেবল একটি খেলনাই নিতে পারবে। একই সময়ে অনেকগুলো খেলনা নেওয়া যাবে না। *এটিই প্রথম নয়* তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব কাজের শুরুটা হয় মিশুর নিজ বাসার সামনে একটি দেয়াল রাঙানোর মাধ্যমে।  ময়লা জমে স্তূপ হয়ে ছিল দেয়ালটি। বিষয়টি ছিল বেশ অস্বস্তির। বাসার নিচে চায়ের দোকান। চা খেতে গেলেই প্রায় তার চোখে পড়ত সেটি। দেয়ালের পাশ দিয়ে হেঁটে চলাই যেন কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর থেকে মুক্তির চেষ্টায় কাজ করতে থাকেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে সাহায্যের আবেদন। এগিয়ে আসে বন্ধুবান্ধবসহ অনেকেই। কেউ রঙ দিয়ে সাহায্য করেন, কেউ আবার অর্থ দিয়ে। ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। দলবল নিয়ে মিশু লেগে পড়েন কাজে। একদিনেই ময়লার পুরো স্তূপটি পরিষ্কার করে দেয়াল রাঙিয়ে তুলেছিলেন তারা। এরপর আরও কঠিন কাজে পা বাড়ান মিশু। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস।  ভারি বর্ষণে পুরো ঢাকা শহর তখন পানির নিচে। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। মোহাম্মদপুরে সে চিত্র ছিল আরও করুণ। মিশু জানতে পারলেন খালে জমে থাকা ময়লার কারণেই বিষয়টি আরও তীব্রভাবে রূপ নেয়। তখনই  ঠিক করলেন,  এবার দেয়াল নয়, পরিষ্কার করবেন ময়লাযুক্ত খাল। সেই ভাবনা থেকেই  ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর  রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ময়লায় ডুবে থাকা একটি খালের আবর্জনা পরিষ্কার করতে মাঠে নামেন তিনি। সাথে তার দলবল। দুদিনেই তারা পুরো খাল পরিষ্কার করে ফেলেন। পাশাপাশি খালের সাথে সংযুক্ত ব্রিজকে রাঙিয়ে তোলেন বিভিন্ন রঙে! *'রিইউজের প্র‍্যাক্টিস তৈরি করা খুব জরুরি'* মিশুর এমন প্রতিটি কাজের পেছনে যেমন আলাদা করে একটি গল্প আছে, তেমনি আছে মহৎ উদ্দেশ্যও। মিশু বলেন, 'একজনের পুরনো ফেলনা জিনিসই হতে পারে আরেকজনের প্রয়োজন। তাছাড়া প্লাস্টিকের কারণে পরিবেশ দূষিত হওয়ার হারও বেশি। এসব যদি রিইউজ করা হয়, তবে তা কেবল কল্যাণই বয়ে আনবে। পরিবেশ রক্ষাও হলো, কারো মুখে হাসিও ফুটল। এই চিন্তা থেকেই করা।" মিশুর মতে, যেকোনো ক্ষেত্রে কোনো একটি জিনিসের পুনর্ব্যবহারের চর্চা করা জরুরি। তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন গুরুজন আহসান হাবীবকে দেখে। উন্মাদের কার্টুন প্রদর্শনীতে পুরনো কিছুকে কীভাবে নতুনভাবে কাজে লাগানো যায় সে চেষ্টাই করতেন তিনি। চলমান প্রদর্শনীতে নতুন সব কার্টুনের ফ্রেম হতো পুরনো। বিষয়টি খুব আকৃষ্ট করে মিশুকেও। সেই ভাবনাকেই পরবর্তীতে কাজে লাগান তিনি। তবে এমন কিছু মানুষ তিনি পাশে পেয়েছেন, যার ফলে ভাবনার বিষয়গুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়াটা অনেক সহজ হয়ে যায়। *এগিয়ে এলেন যারা* প্রতিবারের মতো এ কাজেও শুরু থেকেই অসংখ্য মানুষের সাহায্য পেয়েছিলেন মিশু। যারা প্রায় তার প্রতিটি কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। 'খেলনা দেয়াল' করার কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন ৮-১০ জন। এদের মধ্যে ফুয়াদ, সিদ্দিক, তাহমিদ, সজীব, আজাদ, মিরাজদের কথা উল্লেখ করেন মিশু। এমনকি নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে পাশে থেকেছেন যারা, তাদের নামও উল্লেখ করতে ভোলেননি তিনি। নিজ অর্থায়নে কাজ শুরু করলেও পরবর্তীকালে খেলনা দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন অনেকেই। তাদের একজন নাহিয়ান ইকো। একজন বাংলাদেশি খেলনা ম্যানুফ্যাকচারার। ডিলাক্স টয়েস ইন্ডাস্ট্রিজ ও গোল্ডেন টয়েস ইন্ডাট্রিজের স্বত্বাধিকারী। খেলনা দেয়ালের জন্য তিনি নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠিয়ে দেন দুই কার্টন খেলনা। শুধু নাহিয়ানই নন, তার মতো আরো অনেকেই অর্থ, শ্রম, পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসছেন। মিশু বলেন, "এই মানুষগুলো পাশে না থাকলে হয়তো কোনো কাজেই এগোতে পারতাম না। তারা পাশে ছিলেন বলেই পড়ে থাকা একটি দেয়াল হয়ে গেল 'ফেলনা খেলনা টেলনা দেয়াল'।" এই কাজে শ্রম দিয়ে পাশে ছিলেন যারা তাদের একজন মো. আজাদ হোসেন। নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বললেন, "আমরা যখন কাজ শেষ করে খেলনাগুলো সাজিয়ে রাখলাম, তখন দেখলাম অনেক শিশু তাদের বাবা-মায়ের সাথে এসে খেলনা নিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের চেহারায় খুশির ছাপ। এ দৃশ্য দেখলে কার না ভালো লাগে বলুন? এসব কাজ তো আসলে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে করা উচিত। কারণ আপনার আশেপাশের মানুষ ভালো থাকলেই কিন্তু আপনি ভালো থাকবেন।" মিশুর পরিকল্পনা এখন আরও বড়। রাঙাতে চান আরও দুটি দেয়াল। ঢাকার ভিন্ন দুটি স্থানেই হবে এর বাস্তবায়ন। নতুন করে দেয়াল সন্ধানে নেমেছেন তিনি। মানুষকেও উৎসাহিত করছেন নানাভাবে। মিশু বলেন, "যে কেউ চাইলে এমন উদ্যোগ নিজ নিজ এলাকায়ও শুরু করতে পারে। অনেকে মিলে কাজ করলে সেটি আর কঠিন থাকে না। খরচও বেশি নয়। চারপাশে সুন্দর চিন্তার মানুষ অনেক। শুধু বাস্তবে প্রয়োগের অপেক্ষা।" খুব শীঘ্রই হয়তো আবার দেখা যাবে তাকে। শহরের নোংরা কোনো স্থান বা দেয়াল রাঙানোর কাজে, কিংবা ভিন্নধর্মী কোনো উদ্যোগে। হয়তো আবার নতুন করে গড়ে তুলবেন অন্য কিছু।
Published on: 2024-01-17 10:16:55.245838 +0100 CET