The Business Standard বাংলা
উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়াতে ঋণচুক্তির আগেই অগ্রিম ক্রয়-প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার

উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়াতে ঋণচুক্তির আগেই অগ্রিম ক্রয়-প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার

বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার এবং এর উন্নয়ন অংশীদারেরা পরীক্ষামূলকভাবে 'অগ্রিম ক্রয়' (অ্যাডভান্স প্রকিউরমেন্ট) প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর মাধ্যমে চূড়ান্ত ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার আগেই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করে কয়েক মাস এমনকি বছর পর্যন্ত সময় বাঁচানো যাবে। অগ্রিম ক্রয় বলতে সাধারণত ঋণচুক্তি কার্যকরের আগে পণ্য, সেবা এবং কাজের জন্য ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেওয়াকে বোঝায়। বছরের পর বছর ধরে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অতিরিক্ত সময় এবং ব্যয়সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছে। উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে চূড়ান্ত ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে প্রকল্পগুলো প্রায়শই ধীরগতিতে শেষ হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা বলেছেন, বর্তমানে দুটো প্রকল্পে অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে এবং এতে আশাব্যঞ্জক উন্নতি দেখতে পাচ্ছেন তারা। এর একটি হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)-এর অর্থায়নে ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প। ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ড. মো. মিজানুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড কে বলেন, 'প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে ঢাকা ওয়াসা এনডিবি'র সম্মতি নিয়ে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার আগে অগ্রিম ক্রয় শুরু করেছে। পরামর্শক নিয়োগের সব প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী জুনের আগেই এনডিবি'র সঙ্গে ঋণচুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এ পদ্ধতিতে প্রকল্পের ব্যয়সাশ্রয়ের পাশাপাশি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।' ওয়াসা'র এ প্রকল্পের আগেও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর অর্থায়নে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পে চূড়ান্ত ঋণচুক্তির আগে পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগের জন্য 'অগ্রিম ক্রয়' প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছিল। ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এ. কে. মোহাম্মদ ফজলুল করিম বলেন, '২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্প অনুমোদনের মাত্র দুই মাসের মধ্যে আমরা টেন্ডার শুরু করেছিলাম। এতে পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগের কাজে ছয় মাস সময় কম লেগেছিল।' ইআরডি কর্মকর্তাদের মতে, কেবল ঋণচুক্তির পরে শুরু হওয়া দীর্ঘ ক্রয় প্রক্রিয়া প্রকল্পের অগ্রগতি এবং ঋণের গুরুত্বপূর্ণ গ্রেস পিরিয়ড কমিয়ে দেয়। কোনো কোনো ক্রয় প্রক্রিয়ায় তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এতে গ্রেস পিরিয়ড তথা ঋণ প্রদানের তারিখ থেকে প্রথম কিস্তি আদায়ের মধ্যবর্তী বিরতিকালের সুবিধা পায় না সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, 'আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব দূর করা। অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো আগেভাগে ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল্যবান সময় বাঁচানো।' তিনি আরও বলেন, 'সরকারি সংস্থাগুলো উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পে এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে কাজ করছে। ইআরডি ঋণ আলোচনার সময় যেখানেই সম্ভব অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করতে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে।' যথাসময়ে এবং সাশ্রয়ীভাবে প্রকল্প সমাপ্তির রূপরেখাসহ ২০১৭ সালে 'প্রকল্প প্রণয়ন ও প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য তহবিল এবং ব্যবস্থাপনা নীতি' শিরোনামে একটি গেজেট জারি করা হয়েছিল। গেজেটে কোনো প্রকল্পের মূল নির্মাণপর্ব শুরু করার আগে ক্রয়সহ সব ধরনের প্রস্তুতিমূলক কাজ চূড়ান্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা এখনো কার্যকর করা যায়নি। ইআরডি কর্মকর্তারা বলেছেন, এনডিবি এর প্রকল্প ক্রয় নীতিতে 'অগ্রিম ক্রয়' অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ প্রক্রিয়াটি আরও সহজলভ্য করতে অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গেও তৎপর রয়েছে ইআরডি। যদিও বিশ্বব্যাংক এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অগ্রিম ক্রয়ের বিষয়টি শুরু করেনি, এটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা অধ্যয়ন এবং নকশার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পর্যায়গুলোর জন্য একটি 'প্রস্তুতিমূলক তহবিল' ব্যবহার করে। তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের কিছু সূত্র এ পদ্ধতিটির কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প এ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন করে। প্রকল্পের ৩২০ মিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য এনডিবি'র সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি। গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশে প্রকল্প ঋণ পর্যালোচনা মিশনের সময় 'অগ্রিম ক্রয়' প্রক্রিয়ায় সম্মতি দিয়েছে এনডিবি। ইআরডি এবং ঢাকা ওয়াসার একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। 'অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়ার ফলে প্রকল্পের অন্তত এক বছর সময় বেঁচে যাবে। বিপরীতে, প্রথাগত পদ্ধতিতে চুক্তির পর পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়ার কারণে প্রকল্পের সূচনা হতেই অনেকসময় পাঁচ বছর পর্যন্ত লেগে যায়,' বলেন ওয়াসার ডিএমডি মিজানুর রহমান। তবে ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরামর্শক নিয়োগ করা হলেও প্রকল্পের প্রকৃত কাজ এনডিবি'র সঙ্গে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর শুরু হবে। সম্প্রতি ঢাকা শহরের অন্তর্ভুক্ত হওয়া ১৬টি ইউনিয়নে পানি বণ্টন অবকাঠামো নির্মাণ ও পুনর্বাসন; পদ্মার উত্তর-পশ্চিম সেক্টরে বর্তমানে সেবার বাইরে থাকা এলাকার জন্য পানি সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি; উদ্ভাবনী প্রযুক্তির প্রবর্তনসহ ঢাকার পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কের দক্ষতার উন্নতি ইত্যাদি ওয়াসার এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্পটির লক্ষ্য পানি সরবরাহের প্রায় ৭০ হাজার নতুন সংযোগ তৈরি এবং প্রকল্প এলাকায় অ-রাজস্ব পানির হার ১৫ শতাংশের নিচে আনা। এটি শেষ হলে ঢাকার প্রায় ৩০ লাখ বাসিন্দা উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক প্রকল্প গত বছরের অক্টোবরে এডিবি'র সঙ্গে এ প্রকল্পটির ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্প পরিচালক এ. কে. মোহাম্মদ ফজলুল করিম জানান, প্রকল্পের অধীনে ১৩টি প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্প্রতি শেষ হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এডিবি'র অগ্রিম ক্রয়সুবিধা সময় বাঁচানো ও কাজের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে অগ্রিম ক্রয়ের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এর প্রকল্পগুলোর জন্য ডিফল্ট অপশন হিসেবে অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়া চালু করেছে। এ প্রক্রিয়াটি প্রকল্প শুরুর বিলম্ব কমানো এবং প্রকল্পপ্রস্তুতি বাড়ানোর পাশাপাশি খোদ এডিবি'র খরচের ক্ষেত্রও হ্রাস করে। এডিবি'র ঢাকা অফিস অনুসারে, অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়া এখন তাদের প্রকল্প প্রস্তুতির মানদণ্ডের একটি ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। এ বছরই এ পদ্ধতিটির সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ঠিক করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এডিবি'র এ উদ্যোগটি সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কোঅপারেশন (এসএসইসি) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এডিবি ২০২১ সালের আগস্টে ঢাকা–সিলেট বাণিজ্য করিডোর বরাবর গতিশীলতা, সড়ক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের উন্নতির জন্য ১.৭৮ বিলিয়ন ডলারের মাল্টি-ট্রাঞ্চ ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি (এমএফএফ) অনুমোদন করে। বৈশ্বিক এ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে, এ ঋণটি ৪টি কিস্তিতে দেওয়া হবে। এমএফএফ-এর ৪০০ মিলিয়ন ডলারের প্রথম কিস্তি ঢাকা–সিলেট করিডোর বরাবর প্রায় ২১০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক দুই থেকে চার লেনে প্রশস্ত করার প্রধান চুক্তির প্রাথমিক কাজের অর্থায়নে সহায়তা করবে। এতে ৬০ কিলোমিটার ফুটপাথ, ২৬টি ফুট ব্রিজ এবং ১৩টি ওভারপাস থাকবে। ২.৬৯ বিলিয়ন ডলারের মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে সরকার ৯১১ মিলিয়ন ডলার সরবরাহ করবে। কাজ শেষ হলে আখাউড়া, শেওলা, এবং তামাবিল স্থলবন্দরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে এবং সেখান থেকে ভুটান ও মিয়ানমারে সংযোগকারী একটি নতুন বাণিজ্য রুটের অংশ হবে ঢাকা–সিলেট করিডোর। অগ্রিম ক্রয়ে দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির অন্যতম কারণ হিসেবে ক্রয় প্রক্রিয়ার কথা স্বীকার করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আরও কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন। একটি সমন্বিত দল গঠনের আগে প্রকল্প ব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক এবং প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞদের মতো প্রধান কর্মীদের নিয়োগ করা 'অগ্রিম ক্রয়' উদ্যোগকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অগ্রিম ক্রয়ের জন্য একটি সামগ্রিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, এ প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব (টাইম ওভাররান) কমানো। তাই তিনি এ চ্যালেঞ্জকে কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার পরামর্শ দেন। এমনকি 'অগ্রিম ক্রয়' প্রক্রিয়ার পরও জমি অধিগ্রহণের সমস্যা ও ত্রুটিপূর্ণ প্রাথমিক নকশা প্রকল্পের অগ্রগতি স্থবির করে দিতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত প্রকল্প প্রস্তাব এবং নকশাত্রুটি উভয়েরই ঘন ঘন সংশোধনের নজির রয়েছে। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং প্রকল্পের বাধাহীন বাস্তবায়ন মুখ থুবড়ে পড়ে, বলেন এ অর্থনীতিবিদ।
Published on: 2024-01-02 04:20:39.354671 +0100 CET