The Business Standard বাংলা
ঢাকা: বসবাসের অযোগ্য যে শহরে থাকতে ব্যয় করতে হয় অত্যাধিক

ঢাকা: বসবাসের অযোগ্য যে শহরে থাকতে ব্যয় করতে হয় অত্যাধিক

জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিক থেকে টরন্টো, ক্যালগারি, মন্ট্রিল ও লিসবনের মতো শহরগুলোর কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর। গত নভেম্বরে ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তাদের সর্বশেষ জরিপ প্রকাশ করে। এই জরিপের জন্য, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) ১৭৩ টি শহরের ২০০ টিরও বেশি পণ্য এবং পরিষেবাগুলোর ৪০০ এরও বেশি স্বতন্ত্র মূল্যের তুলনা করেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের তালিকার প্রথমে রয়েছে সিঙ্গাপুর (সূচক মান ১০৪)। আর সবার শেষে অর্থাৎ সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল শহর হল সিরিয়ার দামেস্ক (সূচক মান ১৩)। আর জরিপে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সূচক মান ৫৬। গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৩-এ ১৭৩ টি শহরের মধ্যে জিম্বাবুয়ের হারারে'র সঙ্গে যৌথভাবে ১৬৬ তম অবস্থানে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। এটি সূচকে সপ্তম সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর হিসেবে অবস্থান করছে। তবে দামেস্ক কম ব্যয়বহুল শহর হলেও বিশ্বব্যাপী বসবাসযোগ্যতার র‍্যাংকিংয়ে নিচে অবস্থান করছে (১৭৩ তম স্থান)। অপরদিকে ঢাকা একদিকে যেমন ব্যয়বহুল শহর ঠিক তেমনি বসবাসেরও অযোগ্য। আগের বছরের সূচকে ঢাকা নিচের দিক থেকে সপ্তম স্থানে অবস্থান করেছিল। বাসযোগ্য শহরগুলো পাঁচটি দিক বিবেচনা করে পরিমাপ করা হয়েছে। সেগুলো হলো, স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো। তবে ঢাকা ছাড়াও অন্যান্য বেশ কয়েকটি শহর রয়েছে যা খুব ব্যয়বহুল এবং বাসযোগ্যতা সূচকে নিচে অবস্থান করছে। উদাহরণস্বরূপ, হংকং বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে পঞ্চম ব্যয়বহুল শহর। কিন্তু বাসযোগ্যতা সূচকে এটি ৯২ তম অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, কানাডার ক্যালগারি ১৪৫ তম ব্যয়বহুল শহর হলেও বাসযোগ্য শহরের তালিকায় সপ্তম স্থানে অবস্থান করছে। *কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে?* জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, "শুধু জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের ওপর নয়, একটি শহর বাসযোগ্য হবে কি-না তা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।" অধ্যাপক আদিলের মতে, জীবনযাত্রার কিছু সূচক রয়েছে। যেমন, উন্নত পরিবহণে চলাচল, সাশ্রয়ী মূল্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা, ট্র্যাফিক ঘনত্বের পাশাপাশি আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। তিনি বলেন, "যখন আমরা বলি যে, একটি শহরের জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় রয়েছে, এর অর্থ শহরটি তার জনসংখ্যার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের জন্য অত্যন্ত অসাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। একইসাথে জীবনযাত্রার মান এই গোষ্ঠীর জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠবে। সেটা ঢাকা হোক বা হংকং।" তিনি যোগ করেন, "আপনি যদি হংকং ভ্রমণ করেন তবে আপনি দেখতে পাবেন যে, সেখানেও নিম্ন আয়ের লোকেরা খুপরি ঘরের মত স্থানে বাস করে। কারণ তাদের মানসম্মত আবাসনের সক্ষমতা নেই। কম বিনিয়োগে একটি শহরকে বাসযোগ্য করে তোলা যায়। যদি উন্মুক্ত স্থান ও পার্ক থাকে তবে এটি আরও ভালো বিনোদন ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে। এটি প্রচুর অর্থ বিনিয়োগের ওপর নয়, এটি শহরের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে।" অধ্যাপক আদিলের ভাষ্যমতে, যদি কোনও শহরে খুব বেশি বিনিয়োগ হয় তবে এর অর্থ আপনি বিনিময়ে কিছু পেতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছেন। শহরটি আসলে এর সাথে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। মেগাসিটিগুলোতে বিশাল জনসংখ্যা রয়েছে, যা সবকিছুর জন্য উচ্চ চাহিদা তৈরি করে। তিনি বলেন, আদর্শ পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি শহরে অ্যাক্সেসযোগ্য অবকাঠামো, অ্যাক্সেসযোগ্য আবাসন এবং অ্যাক্সেসযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা থাকতে পারে। সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, কানাডা এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশসমূহের শহরগুলো উভয় সূচকে উচ্চতর স্থানে রয়েছে - জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি এবং তারা অত্যন্ত বাসযোগ্য। কারণ উন্নত দেশগুলো জীবনযাত্রার গড় মান বজায় রাখে। শুধু একটি বা দুটি শহরের জন্য নয়, এই দেশগুলোর প্রতিটি শহরই কমবেশি একইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিকল্পনা করা হয়। তিনি আরও বলেন, "কিছু শহরকে ব্যয়বহুল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ সেই শহরগুলোতে সম্ভবত বেশি হোয়াইট কলার চাকরি (যে ধরণের কাজে কায়িক শ্রম নয় মানসিক শ্রম লাগে) রয়েছে এবং তাই আবাসনের চাহিদাও বেশি। এর মানে এই নয় যে এই দেশগুলোর অন্যান্য শহরগুলো বাসযোগ্য নয়। তাদের একটি যথাযথ কর ব্যবস্থা রয়েছে; যা দেশব্যাপী রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। সুতরাং যদিও এটি মনে হতে পারে যে জীবনযাত্রার ব্যয় একটি শহরের বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করবে, তবে এটি সব দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়।" এই বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন, ঢাকায় আবাসনের মান খুবই খারাপ। নিম্ন আয়ের মানুষ বস্তিতে বসবাস করে এবং নিম্ন মধ্যবিত্তদের বাসস্থান ভালো মানের নয়। আমাদের পরিবহণ ব্যবস্থারও গুণগত মান নেই। তিনি আরও বলেন, "উন্মুক্ত ও সবুজ স্থান এবং পার্কের পরিমাণে আমরা বিশ্বব্যাপী সর্বনিম্ন। প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মানের মধ্যেও একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।" বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আয়ের স্তরের বৈষম্যের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম খারাপ অবস্থানে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যার মাথাপিছু জিডিপি কম। তাই এ দেশের জীবনযাত্রার মান কম হওয়ার কথা। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে কানাডার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৫৪,৯৬৬ মার্কিন ডলার। যেখানে বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপি ২,৫২৮ ডলার। নয়াদিল্লির ভালো অবকাঠামো রয়েছে। দূষণের কারণে এটি বিশ্বের ২৫ তম ব্যয়বহুল শহর এবং ২০২৩ সালে বাসযোগ্যতা সূচকে ১৪১ তম। তিনি বলেন, "আমাদের শহরগুলো, উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন দেখেছে। এখানে একটি নতুন ধারণা বা পরিকল্পনা প্রবর্তন করা সত্যিই কঠিন। যেসব শহরে ভালো পরিকল্পনা আছে, সেসব শহরে ভালো জীবনযাত্রা উপভোগ করবেন।" তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আর বৈশ্বিক এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশেও জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি। পরিশেষে তিনি বলেন, "আপনি যদি শহুরে সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করতে চান তবে আপনাকে অবশ্যই বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান করতে হবে। ফলে সবকিছুই ব্যয়বহুল হয়ে যায়। আপনি যদি অপরিকল্পিত শহরে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চান তবে আপনাকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে।"
Published on: 2024-01-06 13:09:48.115385 +0100 CET