The Business Standard বাংলা
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আনতে চায় সরকার

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আনতে চায় সরকার

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। তাঁদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। কারণ দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের ধীর গতি, দফায় দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং বরাদ্দ তহবিল দক্ষভাবে ব্যবহার না করতে পারার সমস্যা দীর্ঘদিনের। এছাড়া, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে দেশে ফেরা সরকারি কর্মকর্তা এবং বৈদেশিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অতীতে দক্ষভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সুনাম অর্জন করেছেন এমন কর্মকর্তাদেরও– প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করবে সরকার। গত ২৪ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিমালা সংশোধনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বর্ণনা করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোটাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়। সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন,  "সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পিডি (প্রকল্প পরিচালক) নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। যেসব কর্মকর্তা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিদেশ হতে উচ্চতর ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণ প্রহণ করেছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও সুনাম রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।" সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি "বিশেষজ্ঞ পুল" বা প্যানেল গঠনের নির্দেশ দেন। এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি 'পিডি পুল' গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনও হয়নি।  এমন পরিস্থিতিতে পিডি পুল গঠনের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ পুল গঠন করার সিদ্ধান্ত হলো। ৯ বছর পর বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন সভায় যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চাহিদার প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই প্যানেল থেকে প্রকল্প পরিচালক, উপ-পরিচালক কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পদে পদায়নের বিষয়টি বিবেচনা করবে।" এছাড়া প্রকল্প ব্যয় কমাতে বৈদেশিক পরামর্শক নির্ভরতা কমানোর জন্যও– যথাসম্ভব দক্ষ ও অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সহায়তা নেবে সরকার। ঢাকায় ‍বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সরকারের এ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, "৫৯ বছর বয়সে অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের আরও প্রায় ১০ বছর কর্মক্ষমতা থাকে। সার্ভিস লাইফে তাদের অর্জিত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ জাতীয় সম্পদ। বিশেষ করে, দেশে যখন দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে রয়েছে, তখন তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ধারণা খারাপ নয়।" তবে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করার মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দক্ষ ও অভিজ্ঞর নামে যেনতেন লোক যেন বিশেষজ্ঞ পুলে ঢুকে না পরে– তা নিশ্চিত করতে হবে। "এক্ষেত্রে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিষয়ও রয়েছে। একটি বড় প্রকল্প নেওয়ার সময় হয়তো ওই মন্ত্রণালয়ের কোন কর্মকর্তা আশা করে থাকেন যে, তিনি পিডি (প্রকল্প পরিচালক) হবেন এবং নতুন গাড়ি, বাড়তি বেতন, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। ওই প্রকল্পে যখন অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা পিডি হিসেবে ঢুকবেন, তখন তিনি ডিমোটিভেটেড (নিরাশ) হতে পারেন। সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে"- জানান তিনি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ দরকার। যদি নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে উপযুক্ত মানবসম্পদ যাওয়া যায়, তাহলে অবসরপ্রাপ্তদের নেওয়া ঠিক হবে না। এতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের সুযোগ কমে যাবে। "যদি নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে উপযুক্ত কর্মকর্তা পাওয়া না যায়, তাহলে সীমিত সময়ের জন্য অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োগ দিতে পারে"- যোগ করেন তিনি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার বয়স ৫৯ বছর। প্রতিবছর যুগ্মসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ের শতাধিক কর্মকর্তা অবসরে যান। তাদের মধ্যে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায় থেকে অবসরে যাওয়া কিছু কর্মকর্তা যে মন্ত্রণালয় থেকে অবসরে যান, ওই মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। তবে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রকল্পের পিডি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পাওয়ার ঘটনা বিরল। তারা জানান, নিয়মিত চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান হারুন অর রশিদ চৌধুরী, যিনি এখনও এ দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া, সড়ক সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়ার পর ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান এম এ এন সিদ্দিক। অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)সহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে গৃহিত প্রকল্পের বিস্তৃত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা সংস্থাগুলো অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। মূলত বাংলাদেশের বিভিন্ন আইন-কানুন সম্পর্কে সংস্থাগুলো অবহিত না থাকায়– প্রকল্পের ডিপিপি তৈরিতে এসব কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে থাকে। @সভার অন্যান্য সিদ্ধান্ত বর্তমানে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভূক্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ সম্পৃক্ত থাকে। ফলে বিপুল সংখ্যক প্রকল্প থেকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাছাই সুচারুভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায়– প্রকল্প বাছাইয়ের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের সকল বিভাগের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সচিব সত্যজিত কর্মকার বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি পরিহার এবং সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ পিডি নিয়োগ অত্যাবশক। বিদ্যমান পরিপত্রে ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রকল্পে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডি না করার নির্দেশনা রয়েছে। "কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের পিডি (প্রকল্প পরিচালক) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে এবং প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে"- জানান তিনি। এ প্রেক্ষাপটে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, কোন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কোন সংস্থার প্রকল্পে– ওই মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কোন কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক হতে পারবেন না। ওই সংস্থার কর্মকর্তাদেরই পিডি হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। শুধুমাত্র কারিগরি সহায়তা প্রকল্প বা নিজস্ব প্রকল্প ছাড়া– কোন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তারা প্রকল্পের পিডি হতে পারবেন না। সভায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ বা অনুদানের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব দেন সরকারের নীতি-নির্ধারকরা। পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এডিপিতে সরকারি খাতের খাতের ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অনুপাত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ৬০:৪০, যা গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৬৫:৩৫। ২০১০-১১ অর্থবছর এডিপিতে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের মূল বরাদ্দের ৬৪.১% ব্যবহার করা হয়েছিল, গত অর্থবছর তা বেড়ে ৭২.৪% এ উন্নীত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতে পেরেছে, যার পরিমাণ ছিল মূল বরাদ্দের ৯১.৮%। সত্যজিত কর্মকার সভায় বলেন, বৈদেশিক অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পের অর্থ যথাসময়ে ব্যয় করা না গেলে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কবির সিদ্দিকি জানান, গত ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন উৎস থেকে বাংলাদেশ মোট ৫২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পেয়েছে। তিনি জানান, প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন আরম্ভ করা এবং অর্থ ছাড়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে যথাসময়ে বৈদেশিক ঋণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।  তহবিল ছাড় না হলেও ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী ওই সময়ের জন্য কমিটমেন্ট ফি দিতে হচ্ছে। এপ্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সভায় বলেন, ডিপিপি তৈরি ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণ পর্যায়েই বাস্তবতার নিরিখে প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরম্ভ করার সময় নির্ধারণ করতে হবে, এবং বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য আলোচনার সময় বিষয়গুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।
Published on: 2024-02-15 06:01:33.509778 +0100 CET