The Business Standard বাংলা
হার্ট অ্যাটাক বাড়লেও দেশে পর্যাপ্ত সার্জারির সুবিধা নেই

হার্ট অ্যাটাক বাড়লেও দেশে পর্যাপ্ত সার্জারির সুবিধা নেই

দেশে এখন হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। হার্ট অ্যাটাকের কার্যকর চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা অবকাঠামো নেই দেশে। চিকিৎসা পেশাজীবীদের মতে, হৃদরোগের চিকিৎসা ও সার্জারির মান বেড়েছে, কিন্তু পরিমাণ বেশ কম। প্রতি বছর যে পরিমাণ হার্টের সার্জারি হওয়া প্রয়োজন, দেশে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সার্জারি হচ্ছে। এছাড়া হৃদরোগের চিকিৎসা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। সে কারণে সারা দেশে অকালমৃত্যু বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের তুলনায় হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর সংখ্যা সামান্য কমলেও এটিই বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২২ সালে দেশে মোট মৃত্যুর সর্বোচ্চ ১৭.৪৫ শতাংশ ঘটেছে হার্ট অ্যাটাকে। হৃদরোগসহ (৩.৬৭ শতাংশ) অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে মৃত্যুর হার ২১.১২ শতাংশ। কার্ডিয়াক সার্জন সোসাইটি অভ বাংলাদেশের তথ্যমতে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৪২টি কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট রয়েছে, যার মধ্যে ৩২টি হাসপাতালে কার্ডিওভাসকুলার সার্জারি করার ব্যবস্থা আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত সর্বশেষ হেলথ বুলেটিন বলছে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে বেড অকুপেন্সির হার ১৯১.৫ শতাংশ। কার্ডিয়াক সার্জন সোসাইটি অভ বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ড. আশরাফুল হক সিয়াম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, মাত্র তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে—জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল—কার্ডিয়াক সার্জারি হয়। তিনি আরও বলেন, 'মিটফোর্ড হাসপাতালে সার্জারি চালু হলেও এখন বন্ধ আছে। সিলেট, রংপুর, খুলনায় ক্যাথল্যাব আছে—সেখানে এনজিওগ্রাম হয়, কিন্তু সার্জারি হয় না। বেসরকারি অধিকাংশ সেন্টার ঢাকায় অবস্থিত। কার্ডিয়াক ট্রিটমেন্ট এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক।' চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. নাজমুল হোসেন টিবিএসকে বলেন, বাংলাদেশে ২০০০ সালের পর থেকে কার্ডিয়াক সার্জারি ও হার্টের চিকিৎসার মান অনেক বেড়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সার্জারি হয় না। 'বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০ হাজার সার্জারির প্রয়োজন হয়, কিন্তু করা হয় মাত্র ১০-১২ হাজার। এর ফলে অনেক রোগী চিকিৎসা পান না, অনেকে চিকিৎসা নিতে বিদেশে যান,' বলেন তিনি। গত বছর জাপান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশিত একটি জার্নালের উদ্ধৃতি দিয়ে ড. নাজমুল হোসেন বলেন, প্রতি মিলিয়ন (১০ লাখ) মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কার্ডিয়াক সার্জারি হয় ১,৫০০টি, জার্মানিতে ১,২০০টি—আর বাংলাদেশে হয় মাত্র ৮০-৯০টি। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি মিলিয়নে ১০০টির বেশি কার্ডিয়াক সার্জারি হয়। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কার্ডিয়াক সার্জারি হয় শ্রীলঙ্কায়, প্রতি মিলিয়নে ২৫০টি। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, তামাকের ব্যবহার, স্থূলতা, ট্রান্স ফ্যাট, লবণ বেশি খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম না করা এবং বায়ুদূষণের কারণে দেশে হৃদরোগ এবং হৃদরোগে মৃত্যু বাড়ছে। 'আমাদের দেশে হৃদরোগের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে অকালমৃত্যু বেশি হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই হৃদরোগে মৃত্যুহার বেশি, কিন্তু সেসব দেশে ৭০ বছরের বেশি বয়সি মানুষ বেশি মারা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে ৭০ বছর বয়সের নিচে মৃত্যু বেশি—সেটাই চ্যালেঞ্জ,' বলেন তিনি। *বিভাগীয় শহরে কার্ডিয়াক চিকিৎসা* কার্ডিয়াক সার্জন সোসাইটির ড. সিয়াম বলেন, দেশে অনেক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার আগেই মারা যায়। দেখা যায়, ৫০ শতাংশ রোগী হাসপাতালে আসার আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। তিনি বলেন, আট বিভাগীয় শহরকে হৃদরোগ চিকিৎসায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে, যাতে বিভাগীয় শহরের কোনো রোগীকে ঢাকায় আসতে না হয়। 'হৃদরোগে মৃত্যু কমাতে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হবে।' ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ডা. সোহেল রেজা হার্ট অ্যাটাকের দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এ সময়ের মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে এনজিওপ্ল্যাস্টি করে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হলে ক্ষতিটা কম হয়। সেটি সম্ভব না হলে রক্ত তরল করার ইনজেকশন দিয়ে রেফার করতে হবে। এই ব্যবস্থা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে রাখতে হবে। তিনি বলেন, 'সব জায়গায় তো সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) স্থাপন করা যাবে না। তবে মেডিকেল কলেজগুলোকে অন্তত পর্যাপ্ত চিকিৎসা দিতে হবে; তাহলে অকালমৃত্যু রোধ করা যাবে।' অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের (এনসিডিসি) পরিচালক ড. রোবেদ আমিন বলেন, আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার হাসপাতাল স্থাপনের যে প্রকল্প চলছে, সেখানে ক্যান্সারের পাশাপাশি কিডনি ও কার্ডিয়াক ইউনিটও স্থাপন করা হচ্ছে। 'এতে চিকিৎসার জন্য রোগীদের ঢাকায় আসার হার কমবে। পাশাপাশি সব জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে তো হৃদরোগ ডিপার্টমেন্ট আছে, সেখানেও চিকিৎসা হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে উপজেলা হাসপাতালে এনসিডি কর্নার করা হয়েছে। সেখানে সচেতনতার পাশাপাশি বিনামূল্যে ওষুধ দেয়া হচ্ছে।
Published on: 2024-02-19 07:34:16.049282 +0100 CET