The Business Standard বাংলা
বাংলায় গাড়ির নম্বর প্লেট! ঘাবড়ে গিয়েছিলেন মোনায়েম খান

বাংলায় গাড়ির নম্বর প্লেট! ঘাবড়ে গিয়েছিলেন মোনায়েম খান

১৯৬১ সালের শেষ দিক। এবিএম মূসা সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা শেষ করে ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরলেন। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ফিরলেন সাঁতারু ব্রজেন দাসও। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য দুজনেই দুটি গাড়ি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। ক্রীড়া সংগঠক এফ করিম তাদের বন্ধুস্থানীয়। কাছাকাছি সময়ে তিনিও একটি গাড়ি কিনলেন। ব্রজেন দাসের গাড়িটি ছিল ফক্সওয়াগন বিটল, এবিএম মূসার ফিয়াট এবং এফ করিমের বেবি অস্টিন। তিনজনই গাড়ির নম্বর প্লেট লাগালেন বাংলায়। তখন নম্বর শুরু হতো বিজিডি বা বিজিএ দিয়ে। ব্রজেন লিখলেন বিজিডি-৭, করিম বিজিডি-১২৩ এবং মূসা বিজিএ-৬৫৭। ঢাকার রাস্তায় চলতে শুরু করল গাড়িগুলো। ট্রাফিক পুলিশ পথে পথে দিল বাধা। শেষে পাঁচ আইনে হলো জরিমানা। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় উঠল শোরগোল, চারদিক থেকে বিবৃতির ছড়াছড়ি। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এবিএম মূসার স্মৃতিকথা 'আমার বেলা যে যায়' থেকে জানা গেল ঘটনাটি। পুরোটা অবশ্য বলা হলো না, বাকিটা সব শেষে। *মহাশ্মশান হয়েছিল গোরস্তান* পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয় ১৯৫৪ সালের ৭ মে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আটান্ন সালে জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। সাদা কথায়, তিনি বাংলা ও বাঙালিবিদ্বেষী ছিলেন। তার আমলে কবি নজরুলের চল চল চল কবিতার 'নব নবীনের গাহিয়া গান সজীব করিব মহাশ্মশান' বাক্যের মহাশ্মশান শব্দটি গোরস্তান দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। আইয়ুব খান রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রচলন ঘটাতে চেয়েছিলেন। বাংলা একাডেমিকে এই সংস্কার কাজের দায়িত্বও দিয়েছিলেন। তার এ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে প্রতিবাদলিপি ছাপা হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে ভাষা সংস্কারের প্রতিবাদ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগও রোমান হরফের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গ্রহণ করে। ফলে আইয়ুব খান পিছু হটতে বাধ্য হন। তবে বাংলা সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ১৯৬১ সাল ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী। আইয়ুব সরকার তৎপর ছিল যেন এ উপলক্ষে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না হয়। সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কেজি মোস্তফা, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখকে গ্রেফতার করা হয়। এমনতর আরো চেষ্টা সত্ত্বেও আইয়ুব শাহী সংস্কৃতিকর্মীদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদ ও অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের নেতৃত্বে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী কমিটি গঠিত হয়। ছয় দিনব্যাপী হয় অনুষ্ঠানের আয়োজন। পরের বছর আবার শরীফ কমিশনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে আইয়ুবশাহী শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের প্রয়াস নেয়। ওই শিক্ষানীতি ছিল বস্তুত বাঙালির শিক্ষাক্ষেত্র সংকোচনের নীলনকশা, একইসঙ্গে ইংরেজিকে বাংলার ওপর প্রতিষ্ঠা দেওয়ার অপচেষ্টা। ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ফলাফলে শরীফ কমিশনের সুপারিশও স্থগিত করা হয়। তেমন এক সময়ে বাংলায় নম্বর লিখে এফ করিম, এবিএম মূসা এবং ব্রজেন দাস গাড়ি বের করেন রাস্তায়। *বৈষম্য ছিল ক্রীড়াক্ষেত্রেও* পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ক্রীড়াক্ষেত্রেও পড়েছিল। কারণ খেলোয়াড়রাও বৈষম্যের শিকার হচ্ছিলেন পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই। ১৯৫৬ সালের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবিএম মূসা। সেবার জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বা জাতীয় অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয় লাহোরে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে যাত্রা করে এক বিশাল বহর, ভলিবল টিমের ম্যানেজার হিসাবে মূসাও ছিলেন বহরে। তাতে নারী খেলোয়াড়ের সংখ্যাও নগণ্য ছিল না। ডলি ক্রুজ, লুৎফুন্নেসা বকুল, সুফিয়া, দুই বোন কাজী জাহেদা ও কাজী শামীমা প্রমুখ সবাই পদকও পেয়েছিলেন। ঢাকা থেকে ট্রেনে শিয়ালদহ-হাওড়া, তারপর অমৃতসর-আটারি চেকপোস্ট পার হয়ে দলটির লাহোর পৌঁছতে দুই দিন দুই রাত লেগে গিয়েছিল। শ্রান্ত-ক্লান্ত দলটি লাহোর পৌঁছে দেখল ওয়াইএমসির খেলার মাঠের তাঁবুতে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অথচ অন্য প্রদেশের প্রতিযোগীরা কাছাকাছি হোটেল বা ক্লাবঘরে জায়গা পেয়েছেন। ফেব্রুয়ারির শীতে একদিন তাঁবুতে থাকার পর কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এমন সব বৈষম্যের প্রেক্ষিতে স্বাধিকারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই গুলিস্তান স্টেডিয়ামের সুইমিং পুলকে ঘিরে গঠিত হয় সিসিসি বা চ্যানেল ক্রসিং কমিটি। পঞ্চাশের দশকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়াকে একটি বিশাল কৃতিত্বের ব্যাপার বলে মনে করা হতো। কমিটি ভাবল এই দূর পাল্লার সাঁতারে যদি কৃতিত্ব দেখানো যায় তবে পূর্ব পাকিস্তান খেলার জগতে একটি জায়গা করে নিতে পারবে। সাতান্ন সালের শুরুতেই কমিটির প্রথম সভা হয়েছিল স্টেডিয়ামের প্রধান গেটের বাইরে লা-সানি নামের রেস্তরাঁয়। কমিটির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট এফ করিম এবং এবিএম মূসা সদস্যদের একজন। সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে দূর পাল্লার সাঁতার আয়োজন ছিল দুরূহ ব্যাপার। কিন্তু কমিটির সভ্যরা ছিলেন স্বাধিকারের চেতনায় অনুপ্রাণিত। প্রথমে নন-স্টপ সুইমিং বা বিরতিহীন সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। ২৪, ৪৮ বা ৭২ ঘণ্টার সাঁতার হলো। প্রতিযোগিতা শুরু হলে মেলা বসে গেল। ছয় মাস ধরে একটির পর একটি বিরতিহীন সাঁতার শুরু হলো। প্রতিযোগীদের অন্যতম ছিলেন ব্রজেন দাস। ফলাফল বিচার করে কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ব্রজেন দাসকেই ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার জন্য তৈরি করা হবে। *ব্রজেন দাস দেখালেন বাঙালি দুর্বল নয়* দূরপাল্লার সাঁতারের রুট ঠিক করা হলো নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর। সে ছিল এক এলাহি আয়োজন। ছোট ছোট নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার (কর্মকর্তাদের জন্য), বেতার যোগাযোগ, ডাক্তার বা চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা রাখতে হয়েছিল। সরকারি সংস্থা অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল এবং টিঅ্যান্ডটির সহযোগিতা নেওয়া হলো। বেতার যোগাযোগ নির্বিঘ্ন করতে নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুরের মধ্যবর্তী কয়েকটি স্থান যেমন মুন্সিগঞ্জ, ভাগ্যকুল, মিরকাদিমে ছোট ছোট টাওয়ার বসানো হয়েছিল। চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও যুক্ত হয়েছিলেন আয়োজনে। সাঁতার শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে ব্যবস্থাপকেরা শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও পদ্মার স্রোত পর্যবেক্ষণ করলেন, জোয়ার-ভাটার বৈশিষ্ট্যও খেয়াল করা হলো। মোট ৪৫ মাইল পথ। ১৯৫৮ সালের ২৬ মার্চ রাত দুইটায় নারায়ণগঞ্জের একটি বার্জ থেকে শীতলক্ষ্যায় লাফিয়ে পড়লেন ব্রজেন দাস। নারায়ণগঞ্জে সারারাত উৎসব চলল। সাঁতার শুরু হতেই চলল হাজারো উৎসাহী দর্শকের শত শত নৌকা। বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তান যাত্রা করল নতুন সাফল্যের পথে। নদীর দুই ধারেও ছিল হাজার হাজার মানুষ। কিছুদূর পর পর অনেকে সাঁতারেও সঙ্গী হলেন। রাত পেরিয়ে সকাল হলো, তারপর দুপুর তিনটায় ব্রজেন পৌঁছালেন চাঁদপুর। লঞ্চঘাটে শত-সহস্র মানুষ তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। এ প্রেক্ষিতে ব্রজেন দাসকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হলো। ব্রজেনের সঙ্গে বিলাতে গেলেন ম্যানেজার এস এ মহসিন ও প্রশিক্ষক মোহাম্মদ আলী। খরচ হবে ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড। সুখের বিষয় আওয়ামী লীগ তখন প্রদেশের সরকার। মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান এবং ক্রীড়া বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বাত্মক সহযোগিতা পাওয়া গেল। ব্রজেন আগস্ট মাসে প্রথম চেষ্টাতেই ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে সক্ষম হলেন। এশিয়ার প্রথম চ্যানেল সাঁতারুর কৃতিত্ব লাভ করলেন একজন বাঙালি। অথচ কিনা শারীরিক দুর্বলতার দোহাই দিয়ে বাঙালিকে সেনাবাহিনীতে স্থান দেওয়া হতো না! ব্রজেন দাসের সাফল্য বাঙালিকে প্রত্যয়ী হওয়ার শক্তি জোগাল, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অহমিকায় হানল বড় আঘাত। ১৯৬১ সালে ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে দেশে ফেরেন ব্রজেন, সঙ্গে এনেছিলেন ফক্সওয়াগন গাড়িটি। *আজিম বখশ গাড়িটি চালিয়েছেন* ত্রিশের দশকে ঢাকায় গাড়ির ওয়ার্কশপ গড়ে তুলেছিলেন ফরাশগঞ্জের মওলা বখশ সর্দার, যিনি পরে ফরাশগঞ্জ ক্লাবও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৩৩-৩৪ সালে তিনি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্যাক্সি সার্ভিস চালু করেছিলেন। মওলা বখশের জ্যেষ্ঠ পুত্র আজিম বখশ বলছিলেন, 'ব্রজেন দাসের গাড়িটি আমি অনেকবার চালিয়েছি। সেটির নম্বর ছিল ৭। তিনি থাকতেন ৬৫ নম্বর ফরাশগঞ্জ রোডে। বৌদি মানে ব্রজেনদার স্ত্রীকে ওই গাড়িতে করে তার গানের শিক্ষকের কাছে নিয়ে যেতাম। ষাটের দশকে এখনকার জজ কোর্ট চত্বরে ট্রাফিক পুলিশের দু-তিন ঘরের একটি কার্যালয় ছিল। ওই কার্যালয় থেকে গাড়ির নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হতো। তখন ইংরেজিতে গাড়ির নম্বর লেখার চল ছিল, যেমন ইবিডি-১। ১৯৩২ সালে বেঙ্গল মোটর ভেহিক্যাল ট্যাক্স অ্যাক্ট প্রণয়ন হয়, ১৯৪০ সালে হয় দ্য বেঙ্গল মোটর ভেহিক্যাল রুলস। তার আগে সম্ভবত গাড়িতে নম্বর ছিল না, গাড়ির সংখ্যাও ছিল কম। ঢাকার নবাবদের, সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের, জমিদার ও ধনী ব্যবসায়ীদের গাড়ি ছিল যা হাতে গোনা যেত। পাকিস্তান আমলেও ওই ব্রিটিশ আইনই চালু ছিল।' এবিএম মূসা, এফ করিম ও ব্রজেন দাস যখন বাংলায় নম্বর লিখে গাড়ি রাস্তায় নামালেন তখন ট্রাফিকরা কেন বাঁধা দিয়েছিল আর জরিমানা করেছিল পাঁচ আইনে? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষক আফসান চৌধুরী জানালেন, 'রাস্তায় মূত্রত্যাগ করা, অযথা ঘোরাঘুরি করা বা ভবঘুরেমি, গরুর গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া ইত্যাদি পাঁচটি জরিমানাতুল্য বিষয়কে একসঙ্গে পাঁচ আইন বলে। এটি ব্রিটিশ আইন। মূসা ভাইদেরকে পাঁচ আইনে জরিমানা করা দিয়ে বোঝা যায় বাংলায় গাড়ির নম্বর লেখা বেআইনি ছিল না। বৈধ না হলে তো নির্দিষ্ট আইনেই জরিমানা বা মামলা হতো। ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে তাই অবৈধ হওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে অনভ্যস্ততার কারণে ট্রাফিক পুলিশ চমকে গিয়েছিল তাই জরিমানা করে থাকতে পারে।' পারভীন সুলতানা ঝুমা সাংবাদিক এবিএম মূসার বড় কন্যা। তিনিও বললেন, 'মনে হয় বাংলার ব্যবহার বেআইনি ছিল না তখন, তবে ট্রাফিক পুলিশের আইন হয়তো জানা ছিল না। তাছাড়া সারা দেশেই তখন স্বাদেশিকতার জোয়ার তাই ভয় পেয়ে বা দিশেহারা হয়ে জরিমানা করে থাকবে। আব্বা ও তার বন্ধুদের গাড়িগুলোর নম্বর বাংলায় হওয়া কিন্তু এক বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। আব্বার মুখে শুনেছি, জরিমানার ঘটনা জানাজানি হওয়ায় পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছিল আর প্রতিবাদের ঝড়ও উঠেছিল। এটি ছিল আইয়ুব সরকারবিরোধী সামগ্রিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কর্মসূচিতে একটি নূতনতর সংযোজন। আব্বা গাড়ি চালাতে ভালোবাসতেন। তার গাড়িটা ছিল ফিয়াট ৬০০, টু ডোর। তিনি আমাদের নিয়ে টানা গাড়ি চালিয়ে চট্টগ্রাম এমনকি কক্সবাজারেও গিয়েছেন।' *ছাত্ররা কালি লেপে দিয়েছিল* ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনের বিষয়টি ছাত্রসমাজ সামনে নিয়ে আসে। বাংলায় সাইনবোর্ড, ব্যানার লেখায় জোর দেওয়া হয়। জ্ঞানভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি মোবাশ্বের আহমদ বার্ণিক বলছিলেন, অনুরোধ করা সত্ত্বেও যেসব দোকানদার তাদের ইংরেজি লেখা সাইনবোর্ড পরিবর্তনে গড়িমসি করছিল ছাত্ররা সেগুলোতে কালো কালি লেপে দেয়। এ ব্যাপারে প্রথম সংঘবদ্ধ আন্দোলন শুরু করেছিল মীরপুর বাংলা কলেজের ছাত্ররা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বললেন, 'ষাটের শুরুতে ছোট ছিলাম। তবে যতদূর মনে করতে পারি গাড়ির নম্বর প্লেট বাংলায় লেখা নিয়ে একটি প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল। ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে অফিস, আদালত বা ব্যাংকের রশিদ বাংলায় লেখার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিল ছাত্রসমাজ। আটষট্টি বা উনসত্তর সালে যেমন এক ছাত্রলীগ কর্মী বাংলায় চেক লিখে নিয়ে গেলে ব্যাংক তা গ্রহণ করতে রাজি হয়নি বা ডিজঅনার করে, পরে প্রতিবাদের মুখে তা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এসব বাদ-প্রতিবাদের ফল কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই পাওয়া গিয়েছিল। চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় বাহাত্তর সালে অল্প সময়ের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। তাকে পরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ঢাকার কোন বিষয়টি আপনাকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল? তিনি বলেছিলেন, বাংলা লেখনী। তখন সাইনবোর্ড, ব্যানার হাতে লেখা হতো। তাই অনেকরকম টাইপোগ্রাফি দেখার সুযোগ মিলেছিল সত্যজিৎ রায়ের।' *বঙ্গবন্ধু দুঃখ পেয়েছিলেন* ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে বাংলা একমাত্র রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন ঘটানো সম্ভব হয়নি। ১৯৭৫ সালে তাই বঙ্গবন্ধুকে বলতে শোনা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার তিন বছর পরও অফিস-আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে, ভাষার প্রতি ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে ভালোবাসা আছে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার ১৬ বছর পর সরকার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন জারি করে। ২০১৪ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দেশের সব সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডকে আইনটি কার্যকর করার আদেশ দেয়। ২০১৬ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে এক চিঠির মাধ্যমে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও গাড়ির নম্বর প্লেটে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার অনুরোধ জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মনে হয় কেবল গাড়ির নম্বর প্লেট ব্যতীত অন্য কোথাও বাংলার ব্যবহার ১০০ ভাগ নিশ্চিত করা যায়নি। সুষ্ঠু সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ও সড়কে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্য নিয়ে মোটর যান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ (সংশোধিত ১৯৮৭)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএ গঠিত হয়। তার আগে প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬২ সালে ছিল সুপারিনটেনডেন্ট অব রোড ট্রান্সপোর্ট মেইন্টেন্যান্স যেটির নামকরণ ১৯৭৭ সালে হয় ডাইরেক্টরেট অব রোড ট্রান্সপোর্ট মেইটেন্যান্স। বিআরটিএ গঠনের আগে মোটরযান-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যাবলি, যেমন রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স-সংক্রান্ত কাজ করত পুলিশ বিভাগ, আন্তঃজেলা রুট পারমিট ছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন, আঞ্চলিক রুট পারমিট দিত জেলা প্রশাসন। ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা ছিল ৫৭ লক্ষের বেশি। ২০১২ সাল থেকে বিআরটিএ ডিজিটাল নম্বর প্লেট দেওয়া শুরু করে। গাজীপুরের মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে তৈরি হয় নম্বর প্লেট। সবগুলোই নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের হয়ে থাকে, তবে গাড়ির ধরন ও ক্রমিকভেদে বর্ণ ও সংখ্যা আলাদা হয়। যেমন একটি গাড়ির নম্বর ধরা যাক ঢাকা মেট্রো ক ১১-১২৩৪। এখানে ঢাকা মেট্রো দিয়ে বোঝানো হচ্ছে গাড়িটি ঢাকা মেট্রোপলিটনের অধীনে, ১১ হলো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং ১২৩৪ হলো গাড়ির সিরিয়াল বা ক্রমিক নম্বর এবং ক হলো গাড়ির ধরন বা ক্যাটাগরি। এমন মোট ১৯টি ক্যাটাগরি আছে। এর মধ্যে একটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জন্য, বাকি ১৮টি সর্বসাধারণের জন্য। ১৯টি ক্যাটাগরির সবগুলোই বাংলা বর্ণমালা (ক, খ, ট, দ, য ইত্যাদি) দিয়ে চিহ্নিত। এর মধ্যে ক, খ ও গ হলো প্রাইভেট কারের জন্য, ঘ জিপগাড়ির জন্য, জ মিনিবাসের জন্য, ঝ বড় বাসের জন্য, ট হলো বড় ট্রাকের জন্য। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের সফল উদাহরণ হতে পারে গাড়ির নম্বর প্লেট, যার শুরু ওই ১৯৬১ সালের শেষ দিকে। *সর্বস্তরে বাংলা চালুর প্রথম পদক্ষেপ* এবিএম মূসার স্মৃতিকথার শেষাংশটা এমন: পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ও বিবৃতি দেখে প্রাদেশিক সরকার ঘাবড়ে গেল। পরিষদে মোটর ভেহিকলস অ্যাক্ট সংশোধন করে বাংলায় নম্বর প্লেট লেখা শুধু বৈধ নয় বাধ্য করা হলো। প্রথম প্রথম পরীক্ষায় রোল নম্বরের মতো নম্বরের আগে নোয়া, চট্ট, বরি, ফরি ইত্যাদি লেখা হতো। তাতে আবার গভর্নর মোনায়েম খান আপত্তি করলেন। কারণ তার জেলার (ময়মনসিংহ) নাম শুধু ময় লিখলে ময়দানবের কথা মনে পড়বে। তাই পুরো জেলার নাম নম্বরের আগে লেখার বিধান আইনে সংবলিত হলো। আমার মনে হয়, গাড়িতে নম্বর লেখাই হচ্ছে সর্বস্তরে বাংলা চালুর প্রথম বেসরকারি ও সরকারি পদক্ষেপ।
Published on: 2024-02-22 11:04:59.672474 +0100 CET