The Business Standard বাংলা
নীলক্ষেতের শাহজাহান চাচা: পুরনো বইয়ের জন্যে সবাই যাকে চেনে

নীলক্ষেতের শাহজাহান চাচা: পুরনো বইয়ের জন্যে সবাই যাকে চেনে

সম্রাট শাহজাহান বানিয়েছিলেন মমতাজের জন্য প্রেমের বাগান। আর শাহজাহান চাচা বানিয়েছেন পাঠকের জন্যে পুরনো বইয়ের দোকান 'শাহজাহান সেবা বুক শপ'। পুরনো বইয়ের একটা অন্যরকম গন্ধ আছে। গন্ধটা খুব চেনা চেনা। পুরনো বইয়ের হলদে হওয়া পাতায় লেপ্টে থাকে কত স্মৃতি। বছর ত্রিশেক আগে যে বই অন্য কারো বইয়ের আলমারিতে সযত্নে রাখা ছিল, সেই বই এখন নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানে। কেউ কেউ বই বিক্রি করে দেয় এটা যেমন সত্যি, তেমনি কেউ হয়ত অনিচ্ছায় হারিয়ে ফেলে খুব পছন্দের কোনো বই। তারপর হাতবদল হতে হতে সেসব বই জায়গা করে নেয় শাহজাহান কাকার দোকানে। আদতে বইগুলো কিন্তু হারায় না, যত্নে রাখা থাকে। এই শাহজাহান সেবা বুক শপের সারি সারি বই ধরে রেখেছে কত প্রিয় মানুষের ভালোবাসার স্মৃতি। বইপ্রেমীদের কাছে পুরনো বইয়ের প্রতি আলাদা একটা আবেদন আছে। আর তাই পাঠক নীলক্ষেতের গলিঘুপচিতে ঘুরে ফিরে শাহজাহান বুকশপে আটকে যেতে বাধ্য। আহা, নস্টালজিয়া! মোহাম্মদ শাহজাহান; এসব দোকানের নিয়মিত ক্রেতারা যাকে শাহজাহান চাচা বলেই চিনে থাকেন। মুখ ভর্তি সাদা দাঁড়ি। পরনে সাদা গেঞ্জি আর লুঙ্গি। বইয়ের পাহাড় সাজিয়ে বসে আছেন নীলক্ষেতের কোনো এক গলির শেষ প্রান্তে। না চিনলে গোলকধাঁধায় হারানোর সম্ভাবনা জোরালো। তবু পাঠক খুঁজে নেয় এই দোকান। কোনো কোনো পাঠক আসে ধুলোমাখা পুরনো স্মৃতির খোঁজে কিংবা দুষ্প্রাপ্য কোনো বইয়ের একখানা কপির সন্ধানে। গলি দিয়ে ঢুকে একদম শেষের ছোট্ট একটা দোকান। খুবই ছোটো পরিসরের এক টুকরো জায়গা। গলির মাথায় দাঁড়িয়েও ঠাওর করা সম্ভব না এই এতটুকু জায়গায় অতল বইয়ের সংগ্রহ। প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার বই এইটুকু জায়গার মধ্যেই। দোকানের মধ্যে ছোট্ট একটা ফ্যান ঝুলছে সিলিং বরাবর। কিন্তু বইয়ের ভারে ফ্যান চালানো দায়। দোকানের ভেতরেও জায়গা যতটুকু তার মধ্যে বইয়ের ঠাসাঠাসি৷ বই আর বই। নেই কোনো চাকচিক্য, রঙের বাহার। পাঠকের কয়েক মুহূর্তের জন্যে মনে হতে পারে, দোকানটির দেয়াল এবং ছাদ সিমেন্টের না, বইয়ের তৈরি। অনেক সময় বইয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যান শাহজাহান চাচা। শংকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, সমরেশ বসু থেকে সমরেশ মজুমদার- অরিজিনাল ইন্ডিয়ান প্রিন্টের এমন সব বই যা হয়ত প্রিন্ট আউট, মিলবে না অন্য কোথাও। সেবা প্রকাশনীর সেই মিনি সাইজের ডিটেকটিভ বইগুলো যার সাথে জড়িয়ে আছে নব্বই দশকের কিশোরদের এক মুঠো শৈশব, সেই শৈশবকে বন্দী করে রাখা আছে শাহজাহান চাচার দোকানে। রবার্ট ফ্রস্ট, শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতার বই। শুধু বই ই নয়, বইয়ের প্রথম পাতায় মিলে যেতে পারে বহু বছরের পুরনো কোনো মানুষের স্মৃতি। উপহার হিসেবে কোনো ভাই হয়ত কিনে দিয়েছিল ছোটো বোনকে অথবা প্রেমিকের টিউশনির প্রথম টাকা দিয়ে প্রেমিকার জন্যে কেনা বই, কয়েকটা এলোমেলো লাইন আর হাজারো গল্প। হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ- আপনি টুক করে নাম বললেই শাহজাহান চাচা গুগলের মতন করে খুঁজতে শুরু করে দেবেন। ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন কোন বিষয়ে বই চান? পেয়ে যাবেন শাহজাহান সেবা বুক শপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরোরা ফেরদৌস। ২০২১ সাল নাগাদ নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে একটা  গল্পের বই খুঁজে পান। গল্পের বইখানা ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে মুহিত নামের কেউ একজন উপহার দিয়েছিলেন তার প্রিয়তমা রুবীকে। অরোরা "মুহিত চাই" লিখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন মুহিতের সন্ধানে। অরোরার পোস্ট নজরে আসে মুহিতের প্রিয়তমা রুবী পারভীনের। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের রুবী পারভীন ২০২১ সালের পোস্টের সূত্র ধরে অরোরার সাথে যোগাযোগ করে তার হারানো বইটির সন্ধান পান। অরোরা জানতে পারেন, রুবী-মুহিত এখন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের দুটি কন্যা সন্তান। রুবীর উপহারের বইটি কোনোভাবে হারিয়ে যায়। পরে কেউ হয়তো নীলক্ষেতের দোকানে বিক্রি করে দেয় ঐ বই। আর সেখান থেকেই পায় অরোরা। এরকম হাজারো গল্প লুকিয়ে আছে নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকানের আনাচে কানাচে। মোহাম্মদ শাহজাহান ঢাকায় আসেন মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়টাতে। গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারায়। ঢাকা আসবার পর থেকে শুরু হয় শাহজাহানের জীবন সংগ্রাম। তেঁতুল তলায় কাঠের ব্যবসা করতেন একটা সময়। এরপর রাস্তায় রাস্তায় ফেরিওয়ালার কাজও করেছেন।  বিভিন্ন ব্যবসায় অসফল হওয়ার পর শেষে এলেন বইয়ের ব্যবসায়। শুধু ব্যবসার জন্যে ব্যবসা না, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এটিকে পেশা করলেন তিনি। ৫ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন বই বিক্রি করে। চালিয়েছেন সংসার৷ এভাবেই তিন যুগের বেশি সময় ধরে নীলক্ষেতে বইয়ের রাজ্যে রাজত্ব করছেন মোহাম্মদ শাহজাহান। পুরনো বই সংগ্রহ করে থাকেন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। তবে পুরনো বই কেনার ক্ষেত্রে তিনি তদারকি করে বেছে বেছে ভালো বই রাখবার চেষ্টা করেন সবসময়। অবসরে বই পড়তে ভালোবাসেন বলে জানালেন এই বই বিক্রেতা। তাই দোকানে ভিড় না থাকলে কোনো না কোনো বই পড়তে শুরু করেন। নিজে বেশিদূর পড়াশুনা কর‍তে পারেন নি। তবে জানার প্রতি এক ধরনের অদম্য ইচ্ছে কাজ করতো। তাই মানুষের মাঝে বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। *কীভাবে যাবেন?* শাহজাহান সেবা বুকশপের কেতাবি ঠিকানা হচ্ছে ৪২/৬,৭,বই বাজার গলি, ইসলামিয়া মার্কেট, নীলক্ষেত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ইসলামিয়া মার্কেট পেরিয়ে রাফিন প্লাজার গলি। এরপর নিলেন ডানে মোড়। এই মোড়ের শেষদিকটাতে বইবাজার গলি। আর গলির একেবারে শেষের দোকানটাই শাহজাহান সেবা বুক শপ। কোনো পাঠক যদি মিরপুর রোড হয়ে আসেন তবে তাকে থামতে হবে নিউ মার্কেটের ২ নাম্বার গেটের ফুটওভার ব্রিজের সামনে। ব্রিজের পূর্ব পাশেই রাফিন প্লাজা। তার ঠিক ডানদিকেই গলিটাকেই রাফিন প্লাজা গলি নামে চেনে স্থানীয়রা। গলির ভেতরে গেলেই মিলবে শাহজাহান চাচার সেই বইয়ের ছোটোখাটো অগোছালো অথচ সমৃদ্ধ এক দোকান, গপ্প আর কবিতা যেখানে মিলেমিশে থাকে। শাহজাহান সেবা বুক শপের ক্রেতারা বছরের পর বছর ধরে এই দোকান থেকে বই কিনে থাকেন। তবে বইয়ের দাম পুরনো হিসেবে তুলনামূলক বেশি। এক্ষেত্রে অনেক পাঠকই দুষ্প্রাপ্য বই বলে এই বাড়তি দাম দিতে রাজি থাকেন। বই পুরনো হওয়ার কারণে অনেক সময়ই বাইন্ডিং ভালো থাকে না। বাইন্ডিং এর পেছনে র‍য়েছে আরো কিছু খরচ।কথা হচ্ছিল শাহজাহান বুকশপের একজন ক্রেতা তীর্থ বন্দোপাধ্যায়ের সাথে। জানালেন, যেসব পাঠকের শখের বশে পুরনো বইয়ের সংগ্রহ তাদের জন্যে এই বাড়তি দাম তেমন বোঝা না। তবে যেসব শিক্ষার্থী কম দামে ভালো মানের বই পড়তে চান তাদের জন্য বাড়তি দাম এক ধরনের বাধা। শাহজাহান সেবা বুকশপে বই কিনতে এলে পাঠককে আসতে হবে হাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে। জায়গা স্বল্পতার কারণে বসে পড়বার মতন পরিবেশ নেই। তবে পাঠক যদি নির্ধারিত বইয়ের তালিকা আনেন, সেক্ষেত্রে বই কেনা তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। পুরনো বই বলে বইয়ের কন্ডিশন দেখেশুনে বুঝে কেনার ব্যাপার তো থাকেই। এছাড়া পাঠক করতে পারবেন দরদাম। পিডিএফ, ইপাবের যুগে ছাপা বইয়ের সাথে অভ্যস্ততা হারাতে চলেছে। হারিয়ে যাচ্ছে পুরনো বইয়ের দোকানগুলোও। নীলক্ষেতে এখন যেসব পুরনো বইয়ের দোকান রয়েছে সেগুলোতে মানসম্মত বই আর তেমনভাবে দেখা যায় না। একইসাথে দুষ্প্রাপ্য এবং মানসম্মত বইয়ের এই ঐতিহ্যকে এখনো পর্যন্ত ধরে রেখেছে শাহজাহান সেবা বুক শপ। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এসব সাবেকি ধাঁচের পুরনো বইয়ের দোকান স্রেফ গল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে।
Published on: 2024-02-28 07:00:35.117222 +0100 CET