The Business Standard বাংলা
ভারতে ধানের উচ্চফলনশীল জাতে পুষ্টি কমছে, বাংলাদেশে কী ঘটছে?

ভারতে ধানের উচ্চফলনশীল জাতে পুষ্টি কমছে, বাংলাদেশে কী ঘটছে?

খাদ্য নিরাপত্তায় শক্ত ভিত তৈরি করতে বাংলাদেশের মতো একই প্রক্রিয়ায় ভারতও যখন ৫০ বছর ধরে ধানের উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের উদ্ভাবন ও ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়িয়েছে, তখন গবেষণায় জানা গেল এই জাতগুলোর চালে জিঙ্ক ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উৎপাদানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ভারত বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করলেও বাংলাদেশে কোনো স্টাডি বা গবেষণা হয়নি বলে জানিয়েছেন ধানের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে জড়িত প্রধান দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, ভারতের গবেষকরা কমে যাওয়া পুষ্টি বাড়ানোর জন্য যে সুপারিশ করেছে– বাংলাদেশ অবশ্য কয়েক বছর ধরেই চালে সাধারণ মানের চেয়ে বেশি পরিমাণে পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ এসব জাতের আবিষ্কার করেছে। ডাউন টু আর্থ ম্যাগাজিন সম্প্রতি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ (আইসিএআর) এক গবেষণার বরাত দিয়ে উচ্চফলনশীল জাতগুলো কীভাবে 'লো নিউট্রিশনাল' বা কম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই গবেষণায় শুধু জিঙ্ক ও আয়রনের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে তা-ই নয়, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর আর্সেনিকের মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। আইসিএআর এর গবেষকরা বলছেন, আধুনিক জাতগুলো মাটিতে তাদের প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও জিঙ্ক এবং আয়রনের মতো পুষ্টি আলাদা করার ক্ষেত্রে কম দক্ষ। যে কারণে দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে, জিঙ্ক এবং আয়রনের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘনত্ব চালে ৩৩ শতাংশ ও ২৭ শতাংশ এবং গমে ৩০ শতাংশ ও ১৯ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হল, চালে বিষাক্ত উপাদান আর্সেনিকের ঘনত্ব ১,৪৯৩ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ প্রধান খাদ্যশস্য চাল ও গম শুধু কম পুষ্টিকর নয়, স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। আধুনিক প্রজনন কর্মসূচির অধীনে ক্রমাগত জেনেটিক টেম্পারিংয়ের মধ্যে, জাতগুলো বিষাক্ত পদার্থের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও হারিয়ে ফেলেছে। জানা গেছে, বাংলাদেশেও গবেষকরা আধুনিক জেনেটিক টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করছেন। বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই–ব্রি) জিঙ্ক ও আয়রন সমৃদ্ধ মোট ৭টি জাত উদ্ভাবন করেছে। একই সঙ্গে ১৩টি জাত রয়েছে, যেগুলোতে বাড়তি প্রোটিন যোগ করা হয়েছে। যদিও এসব জাত কতটা মাঠে চাষ হচ্ছে এবং এই চালগুলো বাজারে বিশেষভাবে পাওয়া যাচ্ছে কিনা– তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ব্রি-র গবেষকরা বলছেন, চালে সাধারণত প্রোটিন থাকে ৮ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু ১৩টি উচ্চফলনশীল জাত রয়েছে, যেগুলোতে ১০ শতাংশের বেশি প্রোটিন রয়েছে। একই সঙ্গে ৭টি নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যেগুলো বিশেষভাবে জিঙ্ক ও আয়রন সমৃদ্ধ। ব্রি'র মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবির টিবিএসকে বলেন, সারাদেশে যে পরিমাণ চাল উৎপাদন হচ্ছে, তার প্রায় ১৩ শতাংশ হচ্ছে বাড়তি জিঙ্ক ও আয়রন সমৃদ্ধ চাল। অন্যদিকে, প্রেটিনের মাত্রা বাড়িয়েও জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, "আমাদের সফলতা হলো আমরা শুধু উৎপাদন বাড়ানোর জন্যই চাল উৎপাদন করছি না, চালের পুষ্টিগুণ বাড়ানোর জন্যও ব্যাপকভাবে কাজ করছি।" ভারতের চাল ও গমের সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে চাল ও গম আমদানির একটি বড় সোর্স ভারত (অবশ্য বর্তমানে চাল ও গমের রপ্তানি বন্ধ রেখেছে দেশটি)। বেসরকারি চাল ও গম নানানভাবে বাজারে আসলেও সরকারি দপ্তরের চালগুলো নিম্নআয়ের মানুষগুলোর মাঝে ভর্তুকি মূল্যে পৌঁছে দেয় সরকার। এজন্য কম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এবং আর্সেনিকের ক্ষতিকর মাত্রায় কন্টামিনেটেড চালের কারণে বাংলাদেশের মানুষও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। ডাউন টু আর্থ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাল এবং গমের পুষ্টিমানে 'ঐতিহাসিক পরিবর্তন' এসেছে; এটি দেশগুলোর অসংক্রামক রোগের (এনসিডি) ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। গবেষকরা বলছেন, ভারতে যখন সবুজ বিপ্লব শুরু হয়, তখন লক্ষ্য ছিল দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যাকে খাওয়ানো এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া। এজন্য ১৯৮০ এর দশকের পর, ব্রিডারদের মনোযোগ চলে যায় জাত উদ্ভাবনের দিকে। যে জাতগুলো উদ্ভাবন করা হয়– তা কীটপতঙ্গ ও রোগ প্রতিরোধী এবং লবণাক্ততা, আর্দ্রতা ও খরার মতো পরিস্থিতিতে সহনশীল। গাছপালা মাটি থেকে পুষ্টি গ্রহণ করছে কি-না তা ভাবার সময় তাদের ছিল না। তাই, সময়ের সাথে সাথে দেখা গেছে, গাছপালা মাটি থেকে পুষ্টি গ্রহণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। একই অবস্থা বাংলাদেশেরও। ভারতের মতই একই প্রেক্ষাপটে, অর্থাৎ মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য চাল উৎপাদনে নিরাপত্তা তৈরিতে বাংলাদেশেও সবুজ বিল্পব শুরু হয় ১৯৭৩ সাল থেকে। এদেশেও গবেষকরা দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যাকে খাওয়ানোর জন্য উচ্চফলনশীল জাতের দিকেই সম্পূর্ণ মনোযোগী হন। বিভিন্ন ঘাত মোকাবেলা করতে পারে এমন এবং উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের কল্যাণেই দেশ এখন চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩.৯০ কোটি টন চাল উৎপাদন সম্ভব হয়েছে, যেখানে স্বাধীনতার পরপরই এদেশে চালের উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি টনের সীমায়। কৃষি বিভাগ বলছে, চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হয়েছে উচ্চফলনশীল জাতের কল্যাণেই। উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন এবং জাতের সম্প্রসারণের কারণে চালের ভালো উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতে, উফশী বীজ প্রধানত আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে ব্যবহার করা হতো। ২০১৯-২০ অর্থবছরে, সারাদেশে কৃষকরা মোট ১,৪২,২৮৩ টন উফশী বীজ এবং ১৫,৭৭৭ টন হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করেছে, যেখানে শুধুমাত্র ২৬০ টন স্থানীয় ধানের বীজ ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের দুটি প্রতিষ্ঠান উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজ করে। একটি বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং অন্যটি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার (বিনা)। প্রতিষ্ঠান দুটি উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতসহ মোট ১৩৭টি জাত উদ্ভাবন করেছে। গবেষকরা বলছেন, উচ্চফলনশীল জাতগুলোতে নিউট্রিশনাল ভ্যালু কমছে কিনা সে বিষয়ে বিশদ গবেষণা কারোরই নেই। তবে মাটির গুণাগুণ নিয়ে অনেক গবেষণাই রয়েছে। যেগুলোতে উঠে এসেছে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ, সয়েল ইরোশন, একই জমিতে বারবার ফসল ফলানোর কারণে মাটি তার পুষ্টিগুণ হারাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গাছে এবং চালে নিউট্রিশনাল ভ্যালু কমে যাবার সম্ভাবনা কোনোভাবেই অমূলক নয় বলে স্বীকার করছেন গবেষকরা। বিনার মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জাল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "জেনেটিক পোটেনশিয়ালিটি নিয়ে আমাদের গবেষণা না থাকলেও আমরা কিছু কাজ ইতোমধ্যেই করেছি। জিঙ্ক ও আয়রন সমৃদ্ধ জাতই আমরা আবিষ্কার করেছি এবং মাঠেও চাষ হচ্ছে।" তিনি বলেন, "বায়োফর্টিফিকেশনের মাধ্যমে এই পুষ্টি উপাদানগুলো দিয়ে আমরা জাত উদ্ভাবন করছি। অর্থাৎ মাটি থেকে যদি ঘাটতি থাকেও সেটা কিন্তু এই বিশেষ জাতের মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।"
Published on: 2024-03-11 07:49:01.40062 +0100 CET