The Business Standard বাংলা
উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তবু ডলার সংকটের মধ্যে মাছ আমদানির অনুমোদন বেড়েছে

উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তবু ডলার সংকটের মধ্যে মাছ আমদানির অনুমোদন বেড়েছে

দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে থাকলেও অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ পণ্য মাছ আমদানির অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে মৎস্য অধিদপ্তর। চলতি বছরের প্রথম ৩৮ দিনে (১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) অধিদপ্তর ১৬ হাজার ৩২০ টন হিমায়িত ও শুঁটকি মাছ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ২০২২ সাল থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট চলছে। গত বছর এই সংকট চরম আকার ধারণ করে। টাকার মান অবমূল্যায়িত হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এমতাবস্থায় সংকট মোকাবেলায় সরকার অনেক পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করছে। গাড়ি কেনা, বৈদেশিক ভ্রমণেও লাগাম টানা হয়েছে। এরমধ্যেও মৎস্য অধিদপ্তর গত বছর প্রায় এক লাখ টন হিমায়িত ও শুঁটকি মাছ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। বেশিরভাগ মাছ আমদানি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। এছাড়া ভিয়েতনাম, অষ্ট্রেলিয়া, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ থেকেও কিছু মাছ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. আলমগীর টিবিএসকে বলেন, "মৎস্য পণ্য (পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ) আইন ২০২০ অনুযায়ী আমদানির সুযোগ রয়েছে। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৩ সালের মার্চ থেকে পুনরায় আমদানি হচ্ছে।" দেশে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকসহ একটি বিশেষ শ্রেণির নাগরিকদের চাহিদা মেটাতে এক ধরনের মাছ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কিছু কম দামের মাছও আমদানি হয়। মো. আলমগীর বলেন, "সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে আমদানির অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আইনে অনুমোদন থাকলেও এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলের নীতিগত সিদ্ধান্ত দরকার। কারণ দেশের স্বার্থ সবার আগে দেখতে হবে।" মহাপরিচালক জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭৬ হাজার টন এবং চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৭০০ টন মাছ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের আমদানির অনুমোদন পত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে যে-সব মাছ আমদানি হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে হিমায়িত বা চিলড করা রুই, কাতলা, আইড়, বোয়াল, পোয়া, কাচকি, বাইম, ফলুই, রিঠা, ভেটকি, টুনাসহ বিভিন্ন জাতের মাছ। আর কাচকি, চান্দা, লইট্টা, টেংরা, নাইলা, সুরি, উলুয়া জাতের শুটকি মাছও আমদানি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী এই দেশ থেকে। ভারত থেকে বেশিরভাগ মাছ আসছে যশোরের বেনাপোল বন্দর দিয়ে। চাপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ স্থল বন্দর ও সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দর দিয়েও আমদানি হচ্ছে। মাছ আমদানি ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এম ইউ সী ফুড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস টিবিএসকে বলেন, "মিঠা পানির মাছের মধ্যে রুই আমদানি হয় বেশি। আর ইলিশের কয়েকটি জাতসহ সাগরের বিভিন্ন মাছ আমদানি হয়। এসব মাছের আমদানি খরচ বেশ কম এবং স্থানীয় বাজারে চাহিদাও রয়েছে।" সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের রুই মাছের বাজারে ১০ বছর আগেও ভারতের রুইয়ের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। পরে এই বাজারে মিয়ানমারের রুই জায়গা দখল করে নেয়। সম্প্রতি মিয়ানমারের অস্থিরতার কারণে আবারও ভারত থেকে রুই মাছ আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি দেশেও রুইয়ের উৎপাদন বেড়েছে। এসব মাছ আমদানিতে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে তার সঠিক তথ্য নেই মৎস অধিদপ্তরের কাছে। ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার হাওড়ার আড়তে প্রতি মণ রুই মাছ আকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৮ গাজার থেকে ১২ হাজার রুপিতে। প্রতিমণ কাতলা মাছের দামও একই রকম। আকারভেদে প্রতি মণ ভেটকি ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার রুপি পর্যন্ত দামে পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রেশকো ডিস্ট্রিবিউশন নামের একটি কোম্পানি অষ্ট্রেলিয়া থেকে ২০ টন স্যালমন আমদানি করেছে। অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের সেন্টিনেন্টাল গ্লোবাল ট্রেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এই মাছ পাঠিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান গতবছরের জুনে এক টন এবং জুলাইয়ে ৩০ টন স্যালমন মাছ আমদানির অনুমোদন নিয়েছিল। পাবনার সাত তারা মৎস ব্যবসায়ী নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভিয়েতনাম থেকে গত জুলাইয়ে ৫০০ টন ডটেড গিজার্ড শাদ ফিশ আমদানির অনুমোদন পেয়েছিল। এই মাছ দেখতে ইলিশ মাছের কাছাকাছি। হুই ফাত কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠায় এই মাছ। সুবাকো বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২৪.৫ টন ব্যাসা ফিশ ভিয়েতনাম থেকে আমদানির অনুমোদন নিয়েছে। আমদানি করা মাছের তালিকায় রয়েছে সার্ডিন ও সেড মাছও। এই দুইটি মাছ দেখতে ইলিশের মাছে মতো। দেশের বাজারে এগুলো ইলিশ হিসেবেই বিক্রি করেন খুচরা বিক্রেতারা। আর আমদানি করা ক্যাট ফিশের একটি বড় অংশ বিক্রি করা হচ্ছে বাটা মাছ হিসেবে। মৎস অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকাশনায় বলা হয়েছে, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। প্রতিবছরই বাড়ছে মাছের উৎপাদন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও'র 'দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২২'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্ত জলাশয় বা স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বে মোট উৎপন্ন স্বাদুপানির মাছের মধ্যে ১১ শতাংশ উৎপাদন করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ওপর রয়েছে চীন ও ভারত। তারা উৎপাদন করে যথাক্রমে ১৩ ভাগ ও ১৬ ভাগ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে মাছ আমদানি হয়েছে ৯৭,৩৮৩ টন। এসব মাছ আমদানিতে আমদানিকারকদের ওইসময় ব্যয় হয়েছে ৩.৯০ কোটি ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাছ আমদানি হয়েছিল ৭০ হাজার টন। *বেশি আসছে সামুদ্রিক মাছ* দেশে প্রতিবছর যত মাছ আমদানি হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই হলো সামুদ্রিক মাছ। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, গত বছর যে প্রায় এক লাখ টন মাছ আমদানি হয়েছে। তার মধ্যে ৫৮ হাজার টনই সামুদ্রিক মাছ। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে আছে সি ক্যাট ফিশ (মাগুর, শিংসহ অন্যান্য), রুপচাঁদা, সেড বা গিজার্ড সেড, সার্ডিন প্রভৃতি। এসব সামুদ্রিক মাছ আমদানি হচ্ছে মিয়ানমার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এমনকি উরুগুয়ে থেকেও। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৬৮ গ্রাম। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭৪,০৪৩ মেট্রিক টন মাছ রপ্তানি করে; যার মূল্য ছিল ৫,১৯২ কোটি টাকারও বেশি। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। এই সময়ে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৬৯,৮৮০ মেট্রিক টন এবং এই রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪,৭৯০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া মাছের ৬৪ শতাংশ চিংড়ি। এম ইউ সী ফুড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস বলেন, "বাংলাদেশ মাছ রপ্তানি করলেও মূল্য সংযোজন বিশেষ হয়না। যেভাবে মাছ ধরা হয়, সেইভাবেই হিমায়িত করে রপ্তানি হয় বেশি। এ ধরনের মাছের ক্রেতা প্রধানত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশ থেকে চীন মাছ আমদানি করে তাতে মূল্য সংযোজন করে ইউরোপ, আমেরিকাতে রপ্তানি করছে। মূল্য সংযোজন করতে পারলে এ খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।"
Published on: 2024-03-22 16:24:38.485178 +0100 CET