The Business Standard বাংলা
ঠাকুরগাঁওয়ের মোজারেল্লা পনির প্রস্তুতকারী নারীদের বিস্ময়কর সাফল্যগাঁথা

ঠাকুরগাঁওয়ের মোজারেল্লা পনির প্রস্তুতকারী নারীদের বিস্ময়কর সাফল্যগাঁথা

২০১০ সালে নাগিনা নাজনিন বানুর জীবনে আশে অপ্রত্যাশিত এক আঘাত। ওই বছরেই স্বাচ্ছন্দ্যের চাকরি ছেড়ে অসুস্থ বাবার পনির প্রস্তুতের ব্যবসায় হাল ধরতে হয় তাঁকে। তাঁর বাবা  হুমায়ন রেজাই ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ে এ ব্যবসার পথিকৃৎ। এমিনেন্ট এগ্রো ইন্ড্রাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের নাজনিনের প্রতিষ্ঠানটি প্রথম বছরেই ৯ লাখ টাকা আয় করে মূলত মোজারেল্লা পনির উৎপাদনের মাধ্যমে। পিজ্জার মতো দামি খাবারে তৈরিতে যেটি অপরিহার্য উপাদান। মোজারেল্লার আদি উৎপত্তি-স্থল দক্ষিণ ইতালিতে, মূলত টাটকা নরম এই পনির দেশটির একটি বড় অবদান বৈশ্বিক রসনায়। এখন ইতালি ছাড়িয়ে অনেক দেশেই হয় এর উৎপাদন। গরু বা মহিষের দুধ থেকে এই পনির প্রস্তুত করা হয়, যার থাকে মোলায়েম ফ্লেভার ও কিছুটা মিষ্টি স্বাদ। ২০১৭ সালে নাজনিনের বাবা মারা যান, কিন্তু তাঁর ভাগ্য ভালো কারণ জীবদ্দশায় হুমায়ন রেজা ঠাকুরগাঁওয়ে একটি সফল পনির উৎপাদন শিল্প গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। যার সুবাদে দক্ষ শ্রমিক নিয়ে ভাবতে হয়নি। তাই তো ঠাকুরগাঁও জেলায় পনির উৎপাদনে সফল উদ্যোক্তাদের মধ্যে নাজনিনের মতো নারীরাসহ আরও অনেকে রয়েছেন। উত্তরের কৃষি নির্ভর এই জেলায় এখন ৩৩টি পনির উৎপাদন কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি পরিচালনা করছেন সাত নারী উদ্যোক্তা। নাজনিন গর্বের সাথেই উল্লেখ করলেন তাঁর কারখানার আইএসও সনদ পাওয়ার কথা। গ্রাহকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পণ্য বা সেবা সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক মান নিশ্চয়তাকারী একটি সংস্থার এই স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। নাজনিন বলছিলেন, আমি যখন কারখানা চালু করি, তখন ঠাকুরগাঁওয়ে অনেকে কারখানা বন্ধ করছিলেন। এ কারণে ভাগ্যগুণে দক্ষ শ্রমিক পেয়ে যাই। শুরুতে ১,৫০০ লিটার দুধ লাগতো প্রতিদিন। বেল্লা ইতালিয়া নামের  স্থানীয় একটি পিৎজা শপে মাসে ৫০০ কেজি করে পনির দেওয়া শুরু করেন। এরপর বিদেশি একটি কোম্পানির সাথে চুক্তি হয়, যারা এখন মাসে ৬ হাজার কেজি মোজারেল্লা পনির নিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে।  বর্তমানে পিজ্জা ইনে পনির দিচ্ছেন নাজনিন। বিপণনের জন্য ঢাকায় তাঁর আলাদা মার্কেটিং অফিস ও লোকজন রয়েছে। নিজেদের পনির উৎপাদনের চিত্র তুলে ধরে নাজনিন বলেন, "মোজারেল্লা, চেডা ও ফিডা জাতের পনিরের চাহিদা গত কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে। করোনা মহামারির কারণে উৎপাদন কিছুটা আপ-ডাউন করলেও, কারখানায় নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন দৈনিক ২২ টন দুধ থেকে পনির উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।" মায়ের কাছে ধারসহ ২৫ লাখ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন যাত্রা। এখন নাজনিনের পুঁজি ৬০ লাখ টাকার উপরে। কারখানা রয়েছে ৫ শতক জমিতে। আগামীতে ৪২ শতক জায়গায় বড় পরিসরে তিনি উৎপাদনে যেতে চান বলেই জানান। *যেভাবে পনির উৎপাদনের হাবে পরিণত হলো ঠাকুরগাঁও* ১৯৮০'র দশকে কৃষকদের সহায়তা দানকারী একটি এনজিও'তে চাকরি করতেন নাজনিনের বাবা হুমায়ন রেজা।  এই প্রতিষ্ঠান মূলত কৃষি নিয়ে কাজ করত। খামারিদের গরু পালনও তাদের কর্মসূচির মধ্যে ছিল। পরামর্শ মতে গরু পালনের ফলে দুধের উৎপাদন বেড়ে যায়। কিন্তু খামারিরা তখন দুধের দাম ঠিকমতো পাচ্ছিল না। এই অবস্থা লক্ষ করেই দুধ থেকে পনির উৎপাদনের আইডিয়া আসে হুমায়ন রেজার। ১৯৮৮ সনে হিউম্যানিট্যারিয়ান এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস, বা সংক্ষেপে 'হ্যাডস' নামে নিজেরই একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এই সংস্থাও গবাদিপশু পালনসহ কৃষি উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতো। তবে পনির উৎপাদনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন হুমায়ন। তিনি ডেনমার্ক থেকে দুজন কনসালটেন্ট নিয়ে এসে এই এলাকার স্থানীয় মানুষকে পনির তৈরি করা শেখান। তাঁদের সহযোগিতায় ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী মোজারেল্লা চিজ তৈরি করা সম্ভব হয়। এরপর একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, 'আর বিদেশি চিজের উপর নির্ভরশীলতা নয়। দেশেই হচ্ছে উৎপাদন।' এরপর ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে প্রথম ৫০ কেজি পনির হ্যাডসের ব্যানারে বাজারজাত হয়। ঠাকুরগাঁওয়ে বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণে পনির উৎপাদনের শুরুটা এখানেই। এরপর ওয়েস্টিন ও রেডিসনের মতো বিলাসবহুল হোটেল ঠাকুরগাঁওয়ের পনির নেওয়া শুরু করে। আন্তর্জাতিক মানের এনজিওর সাথে কাজ করার সুবাদে দেশের সব বিখ্যাত হোটেল মালিকদের সাথে পরিচয় ঘটে হুমায়নের। এরপর কানাডিয়ান ক্লাব, ব্রিটিশ ক্লাবসহ দেশের সব নামজাদা স্থানে হ্যাডসের বানারে মোজারেল্লা ও অন্যান্য ধরনের পনির সরবরাহ শুরু হয়। এনজির ব্যানারে ঋণ না পাওয়ার কারণে ব্যক্তি উদ্যোগে ২০০৩ এমিনেন্ট এগ্রো লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন হুমায়ন রেজা। তবে শুরুতে এমিনেন্টের সব কাজ চলতো হ্যাডসের নামে। এরপর কানাডার রাষ্ট্রদূত আসেন হ্যাডসের প্রধান কার্যালয়ে। সেখানে তারা অর্থায়ন করেন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতের জন্য। এরপর একজন আমেরিকা থেকে এসে পনির উৎপাদন প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন করেন। এই পদ্ধতির ফলে পনিরের মানও আরো উন্নত হয়। এরপর আরেকদফা বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এসে  স্থানীয় নারীদের পনির উৎপাদনে প্রশিক্ষণ দেন। এতে আরো অনেকেই পনির উৎপাদনে ঝোঁকে এবং তাদের হাত ধরেই পনির উৎপাদন ছড়িয়ে যায় জেলাব্যাপী। জেলায় এখন পনির উৎপাদনকারী সাতটি প্রতিষ্ঠানের আইএসও সনদ রয়েছে। আরও ১৩টি পাইপলাইনে আছে। পনির উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য বলছে, কারখানায়গুলোয় ৩৫০ জন শ্রমিক সরাসরি পনির উৎপাদনে জড়িত রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশ নারী। প্রতি দিনে জেলায় ৪ হাজার ২০০ কেজির বেশি পনির উৎপাদন হয়। পাশাপাশি ২৫০ কেজি ঘি ও ২,৫০০ কেজি মাঠা উৎপাদন হচ্ছে এসব কারখানায়। *ঠাকুরগাঁওয়ের পনির এত ভালো কেন* পনির উৎপাদন সাধারণত ঠান্ডা এলাকায় ভালো হয়। উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও হিমালয় পর্বতমালার নিকটবর্তী হওয়ায় পনির উৎপাদন এই অঞ্চলের আবহাওয়ার সাথে খুব মানানসই। একই সাথে উদ্যোক্তারা মানে কোনো ছাড় দেয় না। আরেকটি বড় কারণ হলো– খামারিদের থেকে সংগ্রহ করা দুধের গুণগত উচ্চ মান, যা উন্নত পনির উৎপাদনে অপরিহার্য। পনির উৎপাদনের প্রতিটি কারখানায় শ্রমিকদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সাদা পোশাক (জামা, পাজামা ও ওড়না) পরা বাধ্যতামূলক। শ্রমিক মালিকরা হাতে গ্লাভস পড়েন। মাথায় নেট ব্যবহার করেন। শ্রমিকদের পোশাক পরিবর্তনের জন্যও রয়েছে আলাদা কক্ষ। কারাখানার মেঝে শতভাগ পাকা করা। পরিষ্কার রাখা হয় সব সময়। কারখানার মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ। কেউ জরুরিভাবে প্রবেশ করতে চাইলে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। আর পনির উৎপাদনের শেষ ধাপের দিকে এগুলো সব ডিপ ফ্রিজে রাখা হয়। এরপর তা বিক্রির উপযোগী হয়। এমিনেন্ট এগ্রোতে দীর্ঘদিন শ্রমিক হিসেবে রয়েছেন বিউটি আক্তার। তিনি জানান, কারখানায় কাজের পরিবেশ খুব ভালো। পনির তৈরি করার পর হাত পরিষ্কার করতে হয় এবং কারখানা এলাকা নিয়মিত ভিনেগার দিয়ে স্প্রে করা হয়। বিউটি বলেন, এমন একটি স্থানে দিনের অধিকাংশ সময় কাটালে বাইরে এসে আর নোংরা স্থান ভালো লাগে না। এই বিষয়টি এখন আমার ও  আমার পরিবারের প্রায় সব সদস্যদের মধ্যে ঢুকে গেছে। বাড়িঘরও আমরা যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের ঠাকুরগাঁও জেলার উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল হক জানান, পনির শিল্প ঠাকুরগাঁওয়ের ক্রমাগতভাবে বড় হচ্ছে। গত বছর জেলায় ২৬টি কারখানা ছিল। যে সংখ্যা বর্তমানে ৩৩টি। "সরকারিভাবে চারটি প্রতিষ্ঠানকে আমরা ঋণ সহায়তা দিচ্ছি। অন্যরাও ঋণের জন্য দরখাস্ত করেছে। তাদের উন্নয়নে আমরা কাজ করছি। তবে এই শিল্প বিকাশে দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থার ভূমিকা বেশি"- যোগ করেন তিনি। *সুনাম কুড়িয়েছেন মাসুমা* ঠাকুরগাঁওয়ের নিশ্চিন্তপুর এলাকার গৃহবধূ মাসুমা খানম। পনির তৈরি করে এখন জেলার সফল উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম তিনি। সফল এই নারীর উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটা জানালেন তিনি নিজেই। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাস মাসুমার জন্ম ঢাকার বিক্রমপুরে। তিনি ১৯৭৭ সালে লৌহজং পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক ইয়ার মাহমুদ খানকে বিয়ে করেন। ১৯৮২ সালে ইয়ার মাহমুদ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পেটে অস্ত্রোপচার করতে হয়। অসুস্থ হওয়ার পর তিনি আর চাকরি করেননি। দুই সন্তান আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে চলে আসেন ঠাকুরগাঁও শহরে ননদের বাসায়। সেই থেকে ননদের স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসা করেছেন। এরই মধ্যে বড় ছেলে তারিকুল ইসলাম ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে যান। মূলত তার পরামর্শেই ২০১২ সালে মাসুমা পনির উৎপাদনের কারখানা দেন। নিশ্চিন্তপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ভাড়া নিয়ে পনির কারখানা স্থাপন করেন মাসুমা। মাসুমা জানান, ২৭ লিটার দুধ দিয়ে কারখানায় পনির উৎপাদনের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের ব্যবধানে এই কারখানার পনিরের চাহিদা ঢাকায় বাড়তে থাকে। এখন ওই কারখানায় এক দিনে প্রায় আড়াই হাজার লিটার দুধ থেকে পনির উৎপাদন হয়। মাসে এই কারখানা থেকে তার ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আয় আসে। তার প্রতিষ্ঠানে ১৩ জন নারী কাজ করেন। পুরুষ শ্রমিক রয়েছেন ২ জন। মাসুমার সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে তাঁর সন্তানরা পনির উৎপাদনের ব্যবসায় নেমেছেন, তাঁরা পাবনা, বগুড়া ও ঠাকুরগাঁওয়ে পনির কারখানা দিয়েছেন। তাঁর ছোট ছেলের কারখানা আইএসও সনদও পেয়েছে এবং বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করছে। শুধু পনির কারাখানা থেকে মাসুমা ঠাকুরগাঁও শহরে একাধিক প্লট কিনেছেন। সফল এই নারী উদ্যোক্তা উত্তরবঙ্গের নারীদের ক্ষমতায়নের বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহী। ২০১৭ সালে মাসুমাকে 'শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা' পুরস্কার দেয় সিটি ফাউন্ডেশন। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতের অনুদানও পেয়েছে আইএসও সনদ পাওয়া তাঁর প্রতিষ্ঠানটি। *শ্রমিক থেকে মালিক* মমতাজ ফুডের মালিক রশিদা খানমের গল্পটা ভিন্ন। তিনি কয়েক বছর আগেই অন্য একটি পনির উৎপাদন খারখানায় শ্রমিক ছিলেন। এখন তিনি নিজেই উদ্যোক্তা। স্মৃতিচারণ করে রশিদা জানান, "আমি সাধারণ গৃহিনী ছিলাম। এক সময় সংসারে খুব অভাব ছিল। দুই সন্তানকে খাবারও ঠিকমতো দিতে পারতাম না। পরে কাজ শিখে ২০১৫ সালে বাড়ির মধ্যে নিজেই কারখানা চালু করি। এখন আমার কারখানায় আট থেকে ১০ জন নারী শ্রমিকের সহায়তায় নিজেই কারখানা চালাচ্ছি।" নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করে যাচ্ছেন রশিদা। ঠিকাদারির ব্যবসা ছেড়ে এখন তাঁর স্বামীও সাহায্য করছেন। সম্প্রতি রশিদা আইসক্রিম তৈরির মাধ্যমে তাঁর ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। এতে দুধের অপচয় কমে গেছে। তিনি বলেন,  "দুধের পানিও এখন আর ফেলে দিতে হয় না। সবই কাজে লাগানো যায়।" *চন্দনা রানীর ছাগলের দুধে পনির* চন্দনা রানী স্বামীর পরামর্শে ২০১৭ সালে ঠাকুরগাঁও সদরের ঢোলারহাটে ব্লাকবেঙ্গল ছাগলের খামার গড়েন। একসময় তিনি দুধ ছাগলের বাচ্চাকে খাওয়াতেন। কিন্তু বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের পর তিনি জানতে পারেন ছাগলের দুধের উপকারিতা ও বাজার সম্পর্কে। ১০৩টি ছাগল নিয়ে গড়া এই খামার থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ লিটার পাচ্ছেন তিনি। এসব দুধ তিনি চিজ ল্যান্ড নামক পনির উৎপাদন কারখানায় সরবরাহ করেন। প্রতি কেজি দুধের বাজারমূল্য এখন ১০০ টাকার উপরে। চিজ ল্যান্ডের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম আগে এমিনেন্ট এগ্রো ইন্ড্রাস্ট্রিজ লিমিটেডে মার্কেটিং অফিসার ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি পনির উৎপাদন কারখানা দেন। এখন তার কারখানায় ১০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। এই উদ্যোক্তা জানান, "চাকরি ছেড়ে ২০১৩ সালে ৫ জন শ্রমিক নিয়ে পনির উৎপাদন কারখানা শুরু করি। এখন আমার এখানে ২২ জন শ্রমিক কাজ করেন। ছাগলের দুধে পনির ভালো হয়। আমার কারখানায় উৎপাদিত মোজারেল্লা পনির দেশের সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। পনিরের বাজার যেহেতু বড় বড় হোটেল-রেস্টুরেন্ট, সেহেতু মার্কেটিং ভালো না হলে উদ্যোক্তারা ভালো করতে পারবে না।" *দুধের সরবরাহ* ঠাকুরগাঁওয়ের পনির শিল্পে দুধ সরবরাহ করেন ৩ হাজার ৮৬৫ জন খামারি। এছাড়া গোয়ালা রয়েছে ৭০ জনের বেশি। তারা খামারিদের কাছ থেকে দুধ সরাসরি কারখানাগুলোতে দেন। এ কারণে খামারিরাও উপকৃত হচ্ছেন। খামারি মাহফুজা জানান, "আগে আমরা দেশি গরু পালন করতাম। নিজেদের ইচ্ছেমতো গরুকে খাওয়াতাম। কিন্তু এখন ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কিছু করি না। এ কারণে নিরাপদ দুধ পাওয়া যায়। আমরা এখন গোয়ালার মাধ্যমে পনির উৎপাদন কারখানায় দুধ দিই।" গুলশান আরার স্বামী সামসুজ্জামান কৃষিকাজ করেন। বাড়িতে তিনটি গাভী দেখাশোনা করেন গুলশান আরা। এই নারী জানান, "পনির কারখানায় দুধের চাহিদার কারণে আমাদের ভালো হয়েছে। দুধ বিক্রির জন্য এখন আর বাজারে যেতে হয় না।ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ নিয়েও আর চিন্তা নেই।" জেলায় গরুর খামারি এলাকায় দুধ কালেশন পয়েন্ট রয়েছে। সেখান থেকে গোয়ালারা নির্দিষ্ট সময়ে দুধ সংগ্রহ করেন। পনির উৎপাদন কারখানায় পৌঁছে দিলে প্রতিকেজি দুধের জন্য এক টাকা হারে লাভ দেওয়া হয়। গোয়ালা কালিপদ সরকার জানান, "জেলায় পনির কারখানা হওয়ার কারণে আমরা উপকৃত হয়েছি। এখন আর দুধ বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। ঝড়, বৃষ্টি যাই হোক, আমাদের আয় থেমে থাকে না। আমাদের আয়ের নিরাপদ জায়গা তৈরি হয়েছে।" গরুর দুধ উৎপাদনের জন্য সুষম খাবার খুর জরুরি। ভুট্টার সাইলেজ এ ক্ষেত্রে ভালো খাবার বলে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান। পশুখাদ্যের ওপর ভিত্তি করে ঠাকুরগাঁওয়ে সাইলেজ কারখানাও গড়ে উঠেছে। শুদ্ধ এগ্রো তাদের মধ্যে অন্যতম। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক গোলাম সারোয়ার রবিন বলেন, গত বছর ১২ হাজার টন সাইলেজ উৎপাদন করেছি। এগুলো শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খামারিরা কিনছেন। এটি গরুর অত্যন্ত ভালো খাবার, এবং কয়েক বছর সংরক্ষণ করা যায়। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুধ শিল্পের চাহিদার কারণে জেলায় ২ লাখের বেশি গাভি রয়েছে। পনির কারখানার সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ার কারণে দুধের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে খামারিরা দুধের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। এ কারণে নতুন নতুন উদ্যোক্তা বাড়ছে। *ঠাকুরগাঁওয়ের পনিরের সম্ভাবনা* পনির শিল্পের সঠিক তথ্য জেলার সরকারি কোনো দপ্তরে পাওয়া যায়নি। তবে ঠাকুরগাঁওয়ে পনির শিল্পের উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্রঋণসহ বিভিন্ন সহায়তা করে আসছে ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। তারা জেলার পনির শিল্প নিয়ে গবেষণার সাথেও যুক্ত। ‍ ‍ইএসডিওর কর্মকর্তা ড. বাবুল চন্দ্র বর্মন জানান, জেলায় দিনে অন্তত ৫০ টন দুধের চাহিদা রয়েছে। পনির উৎপাদন হয় প্রতিদিন অন্তত ৪২০০ কেজি। দেশে মোজারেল্লা পনিরের দৈনিক চাহিদা ৫ থেকে ৬ হাজার কেজি। তার মধ্যে ঠাকুরগাঁওইয়েই উৎপাদন ৭৫ ভাগ। প্রতি কেজি পনির বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে। এই হিসাবে বছরে ৯০ কোটি ৭২ লাখ টাকার উপরে পনির উৎপাদন হয় জেলায়। ইতোমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানির জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে। তারা রাজি হলে প্রতি মাসে ঠাকুরগাঁও থেকে ৪  হাজার কেজি পনির শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি সম্ভব হবে'-যোগ করেন তিনি। এছাড়া, নিরাপদ দুধ উৎপাদনের জন্য ঠাকুরগাঁওয়ে দাতা প্রতিষ্ঠান ইফাদ ও ডেনমার্ক সরকার ও বাংলাদেশের পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ইএসডির মাধ্যমে খামারিদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। এছাড়া, নিরাপদ দুধ উৎপাদনের জন্য ঠাকুরগাঁওয়ে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) "রুরাল মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ ট্রান্সফর্মেশন প্রজেক্ট' এর আওতায় খামারিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যাতে তা দিয়ে উচ্চ মানের পনির উৎপাদন করা যায়। দাতা প্রতিষ্ঠান ইফাদ ও ডেনমার্ক সরকার ইএসডির মাধ্যমে খামারিদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তাও দিচ্ছে। ইএসডির নির্বাহী পরিচালক ড. মো. শহীদ উজ জামান বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা পনিরসহ অন্যান্য খাতে উৎপাদন সুবিধা, বাজার চাহিদা, ভ্যালুচেইন কর্মকাণ্ড শক্তিশালী করতে চাই। এর সুফলও ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টরা পেয়েছেন। আমরা এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাই।
Published on: 2024-03-08 06:10:51.908386 +0100 CET