The Business Standard বাংলা
কোন দেশে ইফতারের খাবারের কেমন খরচ

কোন দেশে ইফতারের খাবারের কেমন খরচ

রোজাদার ব্যক্তিরা সারাদিন রোজা পালন শেষে সূর্যাস্তের পর ইফতারের মাধ্যমে তাদের রোজা ভাঙেন। আর যেসব খাদ্য বা পানীয় দিয়ে তারা ইফতার করেন, সেগুলোকে বলা হয় ইফতারি। ইফতারে সাধারণ একটি খাবার হলো খেজুর। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, মানুষের খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি কারণে ইফতারিতেও নানা বৈচিত্র্য দেখা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন মূল্যস্ফীতি। এই মূল্যস্ফীতি ইফতারিতে কতটুকু প্রভাব ফেলছে, কিংবা এর কারণে ইফতারির খরচ কেমন বেড়েছে, সেটির একটি চিত্র তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা। গত বছরের রমজান মাসের ইফতার খরচের সঙ্গে এ বছরের খরচের তুলনা করে ১৪টি দেশের তথ্য তুলে ধরেছে গণমাধ্যমটি। এতে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রায় সব দেশেই ইফতারির খরচ বেড়েছে। পাঠকের জন্য আলজাজিরার বিশ্লেষণটি তুলে ধরা হলো: *আর্জেন্টিনা* ইফতারে আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে খুবই পছন্দের একটি খাবার বিফ আসাদো (গ্রিল করা মাংস)। এছাড়াও ইফতারে গরুর মাংস কিংবা সবজি দিয়ে তৈরি এমপানাদাস (পিঠা বিশেষ), প্যানকেক ও সতেজ ফলমূলও খান তারা। পানীয় হিসেবে আর্জেন্টিনিয়ানদের পছন্দ ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চা। আলজাজিরার হিসাব অনুযায়ী, দেশটি ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছে। গত বছরের রমজানে এসব খাবারের জন্য জনপ্রতি যেখানে খরচ হতো এক হাজার ৭৮২ পেসো (২ ডলার), সেখানে এবার খরচ হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ২০০ পেসো (৮.৪ ডলার)। দেশটিতে খাবারের খরচের হার আগের বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৩০৩ শতাংশ বেড়েছে। *অস্ট্রেলিয়া* অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় একটি স্ট্রিট ফুড 'হালাল স্ন্যাক প্যাক' (গরম আলুর চিপসের সঙ্গে ভেড়ার মাংস দিয়ে পরিবেশিত এক ধরনের খাবার)। পাশাপাশি সবজির সঙ্গে মসুরের স্যুপ, ল্যামিংটন (এক ধরনের নরম কেক) ও মিষ্টি জাতীয় ফলও অস্ট্রেলীয়দের কাছে ইফতারের অন্যতম আইটেম। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো অস্ট্রেলিয়াও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লড়াই করেছে। আলজাজিরার হিসাবে, এবারের রমজানে এসব খাবারের জন্য জনপ্রতি সাড়ে ১২ অস্ট্রেলিয় ডলার (৮.১ মার্কিন ডলার) খরচ হচ্ছে। অথচ গত বছর যা ১১ অস্ট্রেলিয় ডলার (৭ মার্কিন ডলার)। *বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা* ইউরোপের সর্বোচ্চ মুসলিম বসবাসকারী দেশ বসনিয়ায় ইফতারের টেবিলে সাধারণ বা সুনির্দিষ্ট একটি খাবার পিতা ক্রমপিরুসা (আলু, ময়দা, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন মশলা দিয়ে তৈরি খাবার)। এছাড়াও রয়েছে  তোপা (গলিত পনির ও মাখনের তৈরি খাবার), হারমাসিকা (মিষ্টান্ন বিশেষ), পানীয় হিসেবে রয়েছে চেরি ফলের জুস। এবারের রমজানে জনপ্রতি এসব খাবারে খরচ পড়ছে ২.৯ বিএএম (১.৬ ডলার), গত বছর যা ছিল ২.৭ বিএএম (১.৫ ডলার)। সে হিসেবে খরচ বেড়েছে ৭ শতাংশ। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে আলু, চিনি ও মাখনের, যে কারণে ইফতার পণ্যেরও দামও বেড়েছে। *মিসর* আঙুর পাতায় মোড়ানো চাল, কিমা করা মাংস ও মশলা দিয়ে তৈরি একটি খাবার মিসরীয়দের ইফতার টেবিলের অন্যতম আইটেম। এছাড়াও স্যুপ, কুনাফা (মিষ্টান্ন বিশেষ) ও পানীয় হিসেবে তাদের পছন্দ ঐতিহ্যবাহী কামার আল-দীন। বর্তমানে মিসরও রেকর্ড মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি। এবারের রমজানে মিসরে একজন মানুষের জন্য এসব খাবারের পেছনে খরচ পড়ছে প্রায় ৬৮ মিসরীয় পাউন্ড (১.৪ ডলার)। গত বছর যা ছিল ৩৯ মিসরীয় পাউন্ড (০.৮ ডলার)। সে হিসেবে খরচের হার বেড়েছে ৭৪ শতাংশ। আগের বছরের রমজানের তুলনায় এ বছর দেশটিতে বিভিন্ন পণ্য বিশেষ করে ঘি ও চিনির দাম প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। *ভারত* ইফতারি হিসেবে ভারতীয়দের অন্যতম পছন্দের খাবার ঘুগনি (ছোলা বা মটরশুঁটি দিয়ে তৈরি তরকারি)। পাশাপাশি পাকোরা (পেঁয়াজু বিশেষ), সুজি হালুয়া এবং পানীয় হিসেবে রোজ ড্রিংক। খরচ হিসাবে ব্যতিক্রম দেশ ভারত। অন্যান্য দেশে যেখানে খরচ বেড়েছে, সেখানে ভারতে ইফতারের খরচ কিছুটা কমেছে। এ বছর একজনের জন্য ইফতারের খরচ পড়ছে প্রায় ১৪৯ রুপি (১.৮ ডলার)। গত বছর যা ছিল ১৬২ রুপি (১.৯ ডলার)। খরচ কমার হার ৯ শতাংশ। *ইন্দোনেশিয়া* বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ইফতারের অন্যতম একটি খাবার বুবুর (চাল, মুরগির মাংস, চিনাবাদাম, সবুজ শাক দিয়ে তৈরি খাবার)। পাশাপাশি বাকওয়ান (বিভিন্ন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি পেঁয়াজু বিশেষ), কোলাক পিসাং (মিষ্টান্ন বিশেষ) এবং পানীয় হিসেবে তরমুজ ও নারকেল মিশ্রণে তৈরি শরবত ইন্দোনেশিয়ানদের পছন্দের ইফতার পণ্য। এসব খাবারের জন্য এবার খরচ পড়ছে প্রায় ৬৬ হাজার ৬০০ রুপিয়া (৪.২ ডলার)। গত বছর যা ছিল ৬২ হাজার ৬০০ রুপিয়া (৩.৯ ডলার)। খরচ বেড়েছে ৬ শতাংশ। *মালয়েশিয়া* এ দেশে ইফতারি হিসেবে জনপ্রিয় বিফ রেনদাং। পাশাপাশি মালয়েশিয়ানরা ইফতারে বেগুন, মটরশুঁটি, বাদাম ও নারকেলের দুধ দিয়ে তৈরি সবজি খেয়ে থাকেন। পানীয় হিসেবে অনেকের পছন্দ সিরাপ বান্দুং। মিষ্টান্ন হিসেবে তারা খান সেরি মুকা। এসব খাবারের জন্য এ বছর খরচ পড়ছে ৬.৯ রিঙ্গিত (১.৫ ডলার), গত বছর ছিল ৬.৪ রিঙ্গিত (১.৩ ডলার)। সে হিসেবে ৭ শতাংশ খরচ বেড়েছে। *নাইজেরিয়া* নাইজেরিয়ানদের কাছে জলোফ রাইস (লাল ভাতের সঙ্গে মুরগির মাংস) খুবই পছন্দের একটি খাবার। এছাড়াও রয়েছে মোই মোই (মটরশুঁটি দিয়ে তৈরি পুডিং), সালাদ, জোবো (পানীয় বিশেষ)। এসব খাবারের জন্য এ বছর গুনতে হচ্ছে সাড়ে ৬ হাজার নাইরা (৪.৪ ডলার)। গত বছর যা ছিল তিন হাজার ৮৬০ নাইরা (২.৬ ডলার)। সে হিসেবে খরচ বেড়েছে প্রায় ৬৮ শতাংশ। আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল এ দেশটিও ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির মুখে রয়েছে। দেশটিতে মুরগির মাংসসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম ভয়াবহভাবে বেড়েছে। *পাকিস্তান* পাকিস্তানিদের কাছে ইফতারে জনপ্রিয় খাবার দই বড়া। পাশাপাশি ফলের চাটনি, সালাদ, জিলাপি ও গোলাপের স্বাদযুক্ত বিশেষ পানীয় ইফতারের অন্যতম খাবার। জনপ্রতি এ খাবারের জন্য এবার খরচ পড়ছে ১৭২ রুপি (০.৬ ডলার)। গত বছর যা ছিল ১৪১ রুপি (০.৫ ডলার)। সে হিসেবে খরচ বেড়েছে ১৮ শতাংশ। *ফিলিস্তিন* ইফতারে ফিলিস্তিনিদের পছন্দের একটি খাবার হলো মাকলুবা (মাংস, বেগুন ও অন্যান্য সবজি দিয়ে তৈরি)। এর সঙ্গে তারা খেয়ে থাকেন দাগা (টমেটো, শসা ও অলিভ অয়েল দিয়ে তৈরি খাবার), কাতাইফ (মিষ্টান্ন বিশেষ) ও তামির হিন্দি (তেঁতুল ও চিনি দিয়ে তৈরি পানীয়)। এ রমজানে ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে জনপ্রতি এ খাবারের জন্য খরচ পড়ছে ৩১.৫ সেকেল (৯ ডলার), যা গত বছর ছিল ২৮.৫ সেকেল (৮ ডলার)। সে হিসেবে খরচ বেড়েছে ১১ শতাংশ। অন্যদিকে অব্যাহত ইসরায়েলি হামলার কারণে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষের রোজা পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকের কাছে খাবার তৈরি করা এখন একটি বিলাসিতা।  অনেক মানুষ সেখানে খাবার পাচ্ছে না। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে একটি ডিম কিনতেও গুনতে হচ্ছে ৬ সেকেল (১.৬৪ ডলার)। *দক্ষিণ আফ্রিকা* দক্ষিণ আফ্রিকার মুসলিমদের কাছে ইফতারে পছন্দের খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে শিসা নিয়ামা (ভুট্টা ও বারবিকিউ করা মাংসের খাবার), চাকালাকা (সবজি), কোয়েকসিস্টার্স (মিষ্টান্ন বিশেষ), স্টোনি (পানীয় বিশেষ)। এ খাবারের জন্য খরচ পড়ছে প্রায় ৭৭ র‌্যান্ড (৪ ডলার), যা গত বছর ছিল ৬৮ র‌্যান্ড (৩.৬ ডলার)। খরচ বৃদ্ধির হার প্রায় ১৩ শতাংশ। *তুরস্ক* তুরস্কবাসীর কাছে ইফতারে পছন্দের খাবার দোলমা (সবজি, ভাত, মাংস ও ভেষজ পাতার মিশ্রণে তৈরি বিশেষ খাবার)। এর সঙ্গে রয়েছে চেচিক (দই জাতীয় খাবার), মিষ্টান্ন হিসেবে মুহাল্লেবি (বাদাম, দারচিনি ও দুধ দিয়ে তৈরি পুডিং), সালগম (পানীয় বিশেষ)। এ খাবারের জন্য এ বছর জনপ্রতি খরচ পড়ছে ৬০.৫ লিরা (১.৯ ডলার)। গত বছর এ খরচ ছিল ৫০.৬ লিরা (১.৬ ডলার)। সে হিসেবে খরচ বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে দুধ ও দইয়ের। এ কারণে অনেকেই ইফতারে তাদের খাবারের পরিমাণ বা আইটেম কমিয়ে এনেছেন। *যুক্তরাজ্য* যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় চার মিলিয়ন। ইফতারে তাদের একটি পছন্দের খাবার হলো ভাতের সঙ্গে সবজি ও এক টুকরো স্যামন মাছ। এছাড়া দইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ফলও তাদের পছন্দের ইফতার আইটেমগুলোর একটি। আর ইফতার শেষে এক কাপ গ্রিন টিও পান করে থাকেন ব্রিটিশ মুসলিমরা। এ খাবারের জন্য খরচ পড়ছে প্রায় ২.২ পাউন্ড (২.৭ ডলার)। গত বছর এ খরচ ছিল ২.১ পাউন্ড (২.৬ ডলার)। সে হিসেবে খরচ বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। *যুক্তরাষ্ট্র* যুক্তরাষ্ট্রে তিন থেকে চার মিলিয়ন মুসলিম রয়েছে। ইফতারে তাদের অনেকেরই পছন্দ সবজির সঙ্গে রোস্ট করা চিকেন। এর পাশাপাশি ইফতারে ফ্যাটোশ (টোস্ট করা রুটি ও সালাদ দিয়ে তৈরি খাবার), কুনাফা (মিষ্টান্ন বিশেষ), দুধও খেয়ে থাকেন মার্কিন মুলুকের মুসলিমরা। আলজাজিরার হিসাবে, এসব খাবারের জন্য এই রমজানে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৭.১ ডলার। গত বছর যা ছিল প্রায় ৬.৭ ডলার। সে হিসেবে খরচ বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। অনুবাদ: রেদওয়ানুল হক
Published on: 2024-04-01 14:14:40.995218 +0200 CEST