The Business Standard বাংলা
এমভি আবদুল্লাহ: বিমান থেকে মুক্তিপণের টাকা যেভাবে দেওয়া হয় জলদস্যুদের

এমভি আবদুল্লাহ: বিমান থেকে মুক্তিপণের টাকা যেভাবে দেওয়া হয় জলদস্যুদের

উড়োজাহাজ থেকে তিন বস্তা মার্কিন ডলার সাগরে নিক্ষেপের পর মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর নাবিকরা। ৯টি বোটে করে জাহাজে থাকা ৬৫ জন জলদস্যু নেমে যাওয়ার পর– বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৩টার দিকে জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পায় পণবন্দি ২৩ নাবিক। মুক্তিপণের ডলার পরিশোধ করা হচ্ছে এমন একটি ভিডিওতে দেখা যায়– জাহাজের নাবিকরা জাহাজের ডেকে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। পেছন থেকে নাবিকদের দিকে অস্ত্র তাক করে ছিল দস্যুরা। এসময় এমভি আব্দুল্লাহর পাশ দিয়ে উড়ে যায় একটি বিমান। চক্কর দিতে থাকে জাহাজের আশেপাশে। বিমান থেকে নাবিকদের হাত নাড়তে ইশারা করা হয়। নাবিকরা হাত নাড়ানোর পর বিমান থেকে একে একে তিনটি ডলারভর্তি ব্যাগ ফেলা হয় সাগরে। এরপর আশপাশে থাকা দস্যুদের কয়েকটি স্পিডবোট সেগুলো তুলে নেয়। ডলারের ব্যাগ পেয়ে উল্লাস করতে থাকে জলদস্যুরা। আজ রোববার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীতে জাহাজের মালিকপক্ষ কবির গ্রুপ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে,  এমভি আবদুল্লাহ সোমালিয়া উপকূল থেকে রওনা দিয়েছে। আগামী ২০ এপ্রিল জাহাজটি দুবাইয়ের আল হামরিয়া বন্দরে পৌছাবে। এরপর আকাশপথে নাকি জাহাজে তাঁরা দেশে ফিরবেন – সেটি নাবিকদের যার যার ব্যক্তিগত ইচ্চার ওপর নির্ভর করবে। তবে সোমালিয় জলদস্যুদের দেওয়া মুক্তিপণের অঙ্ক নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি কবির গ্রুপ। কবির গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করীমের কাছে মুক্তিপণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "ক্ষমা চাচ্ছি। কোনো মুক্তিপণের বিষয়ে আমি আপনাদের কিছু বলতে পারব না। সবার সঙ্গে আমাদের এই বিষয় নিয়ে এগ্রিমেন্ট হয়েছে। আমি এগ্রিমেন্টের বাইরে যেতে পারব না।" তবে দুজন জলদস্যু বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, ৫০ লাখ ডলার ডলার মুক্তিপণ পেয়ে ছিনতাই হওয়া জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ও এর ২৩ জন নাবিককে তাঁরা মুক্তি দিয়েছে। আবদির রাশিদ ইউসুফ নামের একজন জলদস্যু রয়টার্সকে বলেন, "...দুই রাত আগে আমাদের মুক্তিপণ দেওয়া হয়। নোটগুলো জাল কিনা প্রথমে আমরা তা পরীক্ষা করি। এরপর তা বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়ে আমরা সরকারি বাহিনীর নজর এড়িয়ে জাহাজ থেকে চলে আসি।" এদিকে রোববারের সংবাদ সম্মেলনে কবির গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, ১৪ বছর আগেও আমাদের একটি জাহাজ জাহান মনি একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছিল। দূর্ভাগ্যজনকভাবে আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। আজ বাংলা নববর্ষের দিনে আমাদের নাবিকরা মুক্ত হল। এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। দ্রুত সময়ের মধ্যে নাবিকদের উদ্ধার প্রসঙ্গে শাহরিয়ার জাহান বলেন, "বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে কনসার্ন ছিলেন। নাবিকদের জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সকলেই আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। বিদেশী যুদ্ধ জাহাজগুলো এমভি আবদুল্লাহয় অভিযান পরিচালনা করতে এর আশেপাশেই অবস্থান করছিল। সরকার এবং আমাদের পক্ষ থেকে যখন সশস্ত্র অভিযানের বিষয়ে অনুমতি না দেওয়ায়– আধঘন্টার মধ্যে সেগুলো সরে যায়। এটি বাংলাদেশ সরকারের দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রতিফলন।" এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে আর্মড গার্ড না নেওয়ার প্রসঙ্গে শাহরিয়ার জাহান বলেন, "আমরা হাই রিস্ক এরিয়ার ৬০০ নটিক্যাল মাইল বাইরে ছিলাম। সেই কারণে আমরা গার্ড নেইনি। এডেন উপসাগরে হুথিদের হামলার কারণে ভারত মহাসাগরে যেসব যুদ্ধজাহাজ চলাচল করতো– সেগুলো লোহিত সাগরে ডাইভার্ট হয়ে যায়। এর সুযোগ নেয় সোমালি জলদস্যুরা। বর্তমানে ভারত মহাসাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন হয়েছে। আশা করছি, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না। সরকার থেকে শিপিং কোম্পানিগুলোকে সেইফটি মেজর মেনে চলার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।" সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, কেএসআেএম এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সারোয়ার জাহান রোকন, কেএসআরএম ডিএমডি করিম উদ্দিন, গণমাধ্যম উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম। *যে প্রক্রিয়ায় উদ্ধার* নাবিকদের উদ্ধার প্রক্রিয়া নিয়ে কবির গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিম বলেন, জাহাজ সোমালিয়ার উপকূলে নিয়ে যাওয়ার পর জলদস্যু কমান্ডারের সহযোগী আমাদের সাথে যোগাযোগ করে। দুই পক্ষের মধ্যে কারা যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে– সেবিষয়ে প্রথম দিনেই আমরা একটি সিদ্ধান্তে চলে আসি। প্রতিদিনই জলদস্যুদের সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। আলোচনার একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল– দ্রুততম সময়ে জাহাজ এবং নাবিকদের মুক্ত করা। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আইন মেনে চলতে হয়। পুরো উদ্ধার প্রক্রিয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে আমরা যোগাযোগ রেখেছি। জলদস্যুদের সাথে যোগাযোগের ফুটেজ আমরা সংস্থাগুলোর সাথে শেয়ার করতাম। আমরা জানি প্রতিটি নাবিক তাদের পরিবারের সাথে কথা বলতো। তারা সুস্থ আছে এটাও আমরা জানতাম। এরপরও জলদস্যুরা জাহাজ থেকে নামার আগে প্রতিটি রুমে আমাদের নাবিকরা কেমন আছে এর ভিডিও নিই। মেহেরুল করীম বলেন, রাত ৩টার দিকে জাহাজের ক্যাপ্টেন আমাকে জানান, ৬৫ জন জলদস্যু ৯টি বোটে করে জাহাজ থেকে চলে গেছে। দস্যুমুক্ত হয়ে জাহাজ নিয়ে রওনা হওয়ার পর নাবিকরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। তারা কবির গ্রুপের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। তিনি আরো বলেন, কবির গ্রুপের মালিকানাধীন এমভি জাহান মনি জাহাজ উদ্ধার এবং নাবিকদের ফিরিয়ে আনতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০০ দিন। সেই জাহাজটির উদ্ধার প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার মাত্র ৩৩ দিনের মধ্যে সোমালি জলদস্যুদের কাছ থেকে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
Published on: 2024-04-14 14:32:51.345951 +0200 CEST